আসামে ভাষা দিবস: আন্দোলনে নারীসহ ১১ শহীদ, ৬ জন সিলেটের

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১২ মাস আগে

Manual1 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

Manual3 Ad Code

ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী। আসাম সরকারের অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আন্দোলনে ১৯৬১ সালের ১৯ মে মাসে ১১ জন প্রতিবাদীকে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে আসাম প্রাদেশিক পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছিলেন সেই ১১ জনের মধ্যে ছয় জনই সিলেটি ছিলেন।
আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছিলেন তারা হচ্ছেন যথাক্রমে কানাইলাল নিয়োগী,চন্ডীচরণ সূত্রধর ,হিতেশ বিশ্বাস ,সত্যেন্দ্রকুমার দেব,কুমুদরঞ্জন দাস,সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ , শচীন্দ্র চন্দ্র পাল ,বীরেন্দ্র সূত্রধর , সুকোমল পুরকায়স্থ ও কমলা ভট্টাচার্য ।

Manual7 Ad Code

১৯৬১ সালে শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আত্মদানকারী ১১ জনের ৬ জনই বর্তমান বাংলাদেশের ৫ জন হবিগঞ্জের ও ১ সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানার ঢাকা দক্ষিণ গ্রামের কৃতি সন্তান ছিলেন। তারা হচ্ছেন যথাক্রমে বীরেন্দ্র সুত্রধর জন্ম ১৯৩৭ পিতা নীলমনি সুত্রধর গ্রাম বাহারামপুর থানা নবীগঞ্জ , শচীন্দ্র চন্দ্র পাল জন্ম ১৯৪২ পিতা গোপেশ চন্দ্র পাল গ্রাম সন্দলপুর থানা নবীগঞ্জ, হিতেশ বিশ্বাস পিতা হরেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস গ্রাম ব্রাহ্মণ ডুরা হবিগঞ্জ, সত্যেন্দ্র দেব জন্ম ১৯৩৬ পিতা শশীমোহন দেব দেউলী হবিগঞ্জ, চন্ডিচরণ সুত্রধর জন্ম ১৯২৬ পিতা চন্দ্রকান্ত সুত্রধর উছাইল হবিগঞ্জ। এ ছাড়া একমাত্র নারী ভাষার জন্য প্রাণ ত্যাগকারী কমলা ভট্টাচার্য আদি সিলেটি। যার বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার ঢাক দক্ষিন গ্রামে।

১৯৬০ সালের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমীয়া ভাষাকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার একটি প্রস্তাবের সূচনা হয়। এতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। অসমীয়া উত্তেজিত জনতা বাঙালি অভিবাসীদের আক্রমণ করে। জুলাই ও সেপ্টেম্বরে সহিংসতা যখন উচ্চ রূপ নেয়, তখন প্রায় ৫০,০০০ বাঙালি হিন্দু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যায়। অন্য ৯০,০০০ বরাক উপত্যকা ও উত্তর-পূর্বের অন্যত্র পালিয়ে যায়। ন্যায়াধীশ গোপাল মেহরোত্রার নেতৃত্বে এক ব্যক্তির একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়।

Manual8 Ad Code

কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কামরূপ জেলার গোরেশ্বর অঞ্চলের ২৫টি গ্রামের ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণ করা হয়; এই জেলা ছিল সহিংসতার সবচেয়ে আক্রান্ত এলাকা। নয়জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং শতাধিক লোক আহত হয়।

১০ অক্টোবর ১৯৬০ সালের ঐ সময়ের অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা অসমীয়াকে আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। উত্তর করিমগঞ্জ-এর বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ২৪ অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়।

আন্দোলনের সূচনা হয় বরাক উপত্যকার বাঙালীদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ নামক সংগঠনটির জন্ম হয়। অসম সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির লোকেরা সংকল্প দিবস পালন করেন । বরাকের জনগণের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করার জন্য এই পরিষদ ২৪ এপ্রিল একপক্ষ দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করেছিল। ২ মে তে শেষ হওয়া এই পদযাত্রাটিতে অংশ নেওয়া সত্যাগ্রহীরা প্রায় ২০০ মাইল উপত্যকাটির গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালিয়েছিলেন। পদযাত্রার শেষে পরিষদের মুখ্যাধিকারী রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি ১৩ এপ্রিল,১৯৬১ সালের ভিতর বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয় তাহলে ১৯ মে তে তাঁরা ব্যাপক হরতাল করবেন। ১২ মে তে অসম রাইফেল, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী শিলচরে ফ্ল্যাগ মার্চ করেছিল।
১৮ মে তে অসম পুলিশ আন্দোলনের তিনজন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরী (সাপ্তাহিক যুগশক্তির সম্পাদক)কে গ্রেপ্তার করে।

১৯ মে তে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হয়। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট ইত্যাদিতে পিকেটিং করেন। শিলচরে তাঁরা রেলওয়ে স্টেশনে সত্যাগ্রহ করেছিলেন। বিকেল ৪টার সময়সূচির ট্রেনটির সময় পার হওয়ার পর হরতাল শেষ করার কথা ছিল। ভোর ৫:৪০ এর ট্রেনটির একটিও টিকিট বিক্রি হয়নি। সকালে হরতাল শান্তিপূর্ণ ভাবে অতিবাহিত হয়েছিল। কিন্তু বিকালে স্টেশনে অসম রাইফেল এসে উপস্থিত হয়। বিকেল প্রায় ২..৩০ মিনিটের সময় ন’জন সত্যাগ্রহীকে কাটিগোরা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একটি ট্রাক তারাপুর স্টেশনের (বর্তমানের শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ) কাছ থেকে পার হয়ে যাচ্ছিল । পিকেটিংকারী সকলে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে দেখে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ভয় পেয়ে ট্রাকচালক সহ পুলিশরা বন্দীদের নিয়ে পালিয়ে যায়। এর পর কোনো অসনাক্ত লোক ট্রাকটি জ্বালিয়ে দেয়। যদিও দমকল বাহিনী এসে তৎপরতার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তারপর প্রায় ২:৩৫ নাগাদ স্টেশনের সুরক্ষায় থাকা প্যারামিলিটারী বাহিনী আন্দোলনকারীদেরকে বন্দুক ও লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে। এরপর সাত মিনিটের ভিতর তাঁরা ১৭ রাউণ্ড গুলি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চালায়। ১২ জন লোকের দেহে গুলি লেগেছিল। তাঁদের মধ্যে ন’জন সেদিনই নিহত হয়েছিলেন; দু’জন পরে মারা যান। ২০ মে তে শিলচরের জনগণ শহীদদের শবদেহ নিয়ে শোকমিছিল করে প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেছিলেন।

এই ঘটনার পর অসম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারী ভাষা হিসাবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর বরাক উপত্যকাসহ ভারতের বিভিন্নপ্রান্তে ১৯ মে কে বাংলা ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এছাড়াও আসামেই বাংলা ভাষার জন্য ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বিজন চক্রবর্তী ও ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই
জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস শহীদ হন। ডেস্ক জেবি

Manual6 Ad Code

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  • ৬ জন সিলেটের
  • আসামে ভাষা দিবস: আন্দোলনে নারীসহ ১১ শহীদ
  • Manual1 Ad Code
    Manual7 Ad Code