স্টাফ রিপোর্টার
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি দেখা গেছে। মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপদস্থ করা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন—কোনো মুহূর্তে কে কোথায় হামলার শিকার হবেন তা বলা যাচ্ছে না।
রাস্তায় চা শ্রমিক পরিবারের তরুণকে অপদস্থ
গতকাল শুক্রবার (১০ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্রীমঙ্গল শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা হয় এক চা শ্রমিক পরিবারের তরুণকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কয়েকজন যুবক তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে এবং প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করায়।
ঘটনাটি পথচারীরা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। সাংবাদিক রিপন দে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করলে নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অনেকে মন্তব্য করেছেন,“শ্রীমঙ্গলে এখন আইনশৃঙ্খলা বলে কিছুই নেই।”
নিখোঁজ সংখ্যালঘু স্কুল ছাত্রী, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে শহরে
প্রায় ১১ দিন আগে শহর থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক স্কুল ছাত্রী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় তার পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বেড়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ ও ভুক্তভোগীরা নিরুপায়
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মিথ্যা মামলার ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবে। অভিযোগ রয়েছে—একটি সংঘবদ্ধ চক্র আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব অপরাধ চালাচ্ছে।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী কয়েকজন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও অপরাধে জড়িত অনেকে এখনও পলাতক। যারা কখনও রাজনৈতিক সুবিধা পাননি বা অপরাধে জড়িত ছিলেন না, তারাও হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
শিক্ষকের বাসায় চাঁদা দাবি, অভিযুক্তকে দল থেকে অব্যাহতি
সম্প্রতি শহরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বাসায় গিয়ে একদল যুবক প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল অভিযুক্ত নেতাকে নোটিশ দিয়ে দল থেকে অব্যাহতি দেয়।
শেভরন পাইপলাইনে অগ্নিকাণ্ড, তিনজনের মৃত্যু
উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের ইলামপাড়া এলাকায় সম্প্রতি শেভরন বাংলাদেশের গ্যাস পাইপলাইনে অবৈধ ট্যাপিং থেকে আগুন ধরে যায়। এতে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়ে মারা যান।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই দশক ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পাইপলাইন থেকে কনডেনসেট চুরি করে আসছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার খবর প্রকাশিত হলেও মূল হোতারা এখনও ধরা পড়েননি। মাঝে মাঝে অভিযান ও গ্রেপ্তার হলেও অপরাধচক্রের গডফাদাররা অদৃশ্যই রয়ে গেছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন ও প্রশাসনের নীরবতা
শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের ছোট নদী ও ছড়াগুলো থেকে প্রতিদিন অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও ধরা পড়ে কেবল ট্রাকচালক, হেলপার বা শ্রমিক—পর্দার আড়ালের গডফাদাররা রয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, “সবাই জানে, সবাই দেখে—কিন্তু প্রতিকার হয় না।”
আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে, প্রশাসন নীরব দর্শক
সাম্প্রতিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে প্রবল হতাশা ও ক্ষোভ। স্থানীয় এক গণমাধ্যম কর্মী নাম না প্রকাশ করা শর্তে বলেন,“শ্রীমঙ্গল এখন ভয়ের নগরে পরিণত হয়েছে। মানুষ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—“কোথায় প্রশাসন? কোথায় আইনের শাসন?”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড
শ্রীমঙ্গলে অসংখ্য ফেক একাউন্ট খুলে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করে এক মহিলার নামে একাউন্ট খোলা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ ইসরাইল হোসেনের মোবাইল নাম্বার ক্লোন করে টাকা দাবি করার অভিযোগও এসেছে। বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসক তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক একাউন্টে পোস্ট করে সবাইকে অর্থ প্রদান না করার জন্য সতর্ক করেছেন।
শ্রীমঙ্গলে মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে এখন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
শ্রীমঙ্গলের মানুষের একটাই দাবি—“নিরাপদ শহর চাই, যেখানে কেউ ভয় পাবেনা এবং আইন সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে।”
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।