ডেস্ক রিপোর্ট: টরন্টো শহর আগামী বছর থেকে তাদের অন্যতম জনপ্রিয় ও ব্যস্ততম সৈকত উডবাইন বিচে মোটরচালিত নৌযান চলাচল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষের মতে, অননুমোদিত রেন্টাল কোম্পানি, বেপরোয়া নৌযান চালক এবং ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রধান কারণ। গত সপ্তাহে টরন্টো সিটি কাউন্সিল এক প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, যাতে পোর্টস টরন্টোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে উডবাইন বিচের তীর থেকে কমপক্ষে ১৫০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মোটরচালিত নৌযান, বিশেষ করে জেট স্কি ও ব্যক্তিগত বোট নিষিদ্ধ করতে। একই সঙ্গে প্রস্তাবে অ্যাশব্রিজ বেতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ নৌযান ভাড়ার ব্যবসারও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন টরন্টোর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সৈকত এলাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলেন, “এই প্রস্তাব পাস হওয়ায় আমি স্বস্তি পেয়েছি। আমাদের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা রক্ষা করা স্থানীয় সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা আর উপেক্ষা করা যায় না।”ব্র্যাডফোর্ড আরও বলেন, “অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে লাইসেন্সবিহীন রেন্টাল ব্যবসা। এই কোম্পানিগুলো সৈকতের কাছাকাছি জায়গায় নৌযান পার্ক করে রাখে এবং অর্থের বিনিময়ে ভাড়া দেয়। ফলস্বরূপ, অনেক অনভিজ্ঞ ও বেপরোয়া চালক গভীর পানিতে চলে যান, যা সাঁতারু, কেয়াকার ও প্যাডেলবোর্ড ব্যবহারকারীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করে। এদের কারণে সমুদ্রসৈকতে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ আহত বা নিহত হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।”
টরন্টোর নাগরিক নিরাপত্তা কমিটির তথ্যমতে, গত তিন বছরে উডবাইন বিচ এবং অ্যাশব্রিজ বেতে নৌযানসংক্রান্ত দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম মৌসুমে অন্তত ১৭টি দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যার মধ্যে কয়েকটি গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। এসব ঘটনার প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই নৌযানগুলো ছিল অবৈধভাবে ভাড়ায় নেওয়া বা নিবন্ধনবিহীন। শহরের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও টরন্টো সম্পূর্ণভাবে নৌযান কার্যক্রম বন্ধ করতে চায় না। বরং লক্ষ্য হচ্ছে, বেসরকারি নৌযান ব্যবহারে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সিটি কর্তৃপক্ষ এখন পোর্টস টরন্টোর সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করছে, যাতে নতুন নীতিমালার আওতায় নৌযান নিবন্ধন, ভাড়া অনুমোদন এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করা যায়।
উডবাইন বিচে নিয়মিত যাতায়াতকারী সাঁতারু ও পরিবারগুলো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা গ্রীষ্মে পরিবার নিয়ে সৈকতে আসি। কিন্তু গত কয়েক বছরে জেট স্কির গতি ও শব্দে আমাদের ভয় লাগত। পানিতে নামতে পর্যন্ত ভয় পেতাম। এখন এই সিদ্ধান্তে নিশ্চয়ই স্বস্তি আসবে।”অন্যদিকে, কিছু রেন্টাল কোম্পানি বলছে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে অনেক বৈধ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাদের মতে, সিটি কর্তৃপক্ষের উচিত অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, কিন্তু পুরো খাতকে বন্ধ না করা। এক রেন্টাল কোম্পানির মালিক বলেন, “আমরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করি। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যক্তি, যারা অনুমোদন ছাড়া নৌযান চালায়। সিটি চাইলে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করে খারাপ খেলোয়াড়দের বাজার থেকে বের করে দিতে পারে।”
টরন্টো সিটি এর আগেও এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এই গ্রীষ্মের শুরুতে সেন্টার আইল্যান্ডের হ্যানলানস পয়েন্ট সৈকতে ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকাজুড়ে মোটরচালিত নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। এটি ছিল পরীক্ষামূলক প্রকল্প, যা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে সেখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। শহরের পশ্চিমাঞ্চল ইটোবিকোকের হাম্বার বেতেও অনুরূপ নিষেধাজ্ঞার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই পিটিশন শুরু করেছেন। তারা মনে করেন, নৌযানগুলোর অপ্রতিরোধ্য গতি শুধু সাঁতারুদের জন্য বিপজ্জনক নয়, বরং পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহুরে সৈকতগুলো এখন শুধু বিনোদনের স্থান নয়, বরং জনসাধারণের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেই কারণে নৌযান ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। পোর্টস টরন্টো ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম মৌসুমের আগেই নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। উডবাইন বিচে মোটরচালিত নৌযান নিষিদ্ধের এই উদ্যোগ কেবল নিরাপত্তা বাড়াবে না, বরং টরন্টোর সৈকত সংস্কৃতিকে আরও শান্ত, পরিবারবান্ধব ও পরিবেশসম্মত করে তুলবে—এমনটাই আশা শহরবাসীর।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।