স্কুল-কলেজের অব্যয়িত হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেয়ার উদ্যোগ

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১৭ ঘন্টা আগে

Manual6 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের সরকারি স্কুল-কলেজগুলোর তহবিলে হাজার কোটি টাকা অব্যয়িত অবস্থায় রয়েছে। সরকার ওই টাকা নিজ কোষাগারে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ওই লক্ষ্যে সরকারি স্কুল-কলেজের প্রধানদের বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ওই টাকা দিতে নারাজ। মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় বিভিন্ন খাতে টাকা নেয়া হলেও সব খাতের টাকা ব্যবহার হয় না। আবার এক খাতের টাকা অন্য খাতে খরচ করারও কোনো সুযোগ নেই। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে অব্যয়িত অবস্থায় পড়ে আছে বড় অঙ্কের টাকা। আর ওই অব্যয়িত টাকাই সরকারি কোষাগারে জমা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

Manual8 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এক শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির সময় ফি নেয়া হয় অন্তত ২৫-৩০টি খাতে। তার মধ্যে কিছু কিছু খাতে নেয়া টাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিনেও খরচ করতে পারছে না। ওই টাকা জমা পড়ে থাকে কলেজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সরকার ওই অব্যয়িত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিতে আগ্রহী। সেজন্য খরচ করতে না পারায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকা অব্যয়িত টাকার হিসাব চাওয়া হয়েছে। আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে সমপ্রতি দেশের বড় ২৮টি কলেজ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে তাদের হিসাব। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি কলেজগুলোর হিসাবও দিতে হবে। ইতিমধ্যে অব্যয়িত টাকা দ্রুত সময়ের মধ্যে অব্যয়িত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, কলেজে ছাত্র সংসদ কার্যকর না থাকলেও বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০টি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১০ কোটি ২১ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। আর তপশিলভুক্ত বিভিন্ন খাতে আদায় করা টাকার মধ্যে অব্যয়িত রয়েছে ৯২ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৫ টাকা। ওই ২০ প্রতিষ্ঠানেই শতকোটি টাকার বেশি অব্যয়িত অবস্থায় আছে। আর সব প্রতিষ্ঠানে ওই টাকার পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে হাজার কোটি। মন্ত্রণালয়ের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অব্যয়িত টাকা সরকারের কোষাগারে জমা না দেয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। হিসাব দেয়া কলেজগুলোর মধ্যে অব্যয়িত রয়েছে শুধু ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজে ছাত্র সংসদে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩০৬ টাকা, অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা; কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৬ লাখ ৫১ হাজার ৩৭২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ২৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৯ টাকা; ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫৮ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৩ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫৮৬ টাকা; রংপুরের সরকারি কারমাইকেল কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১ কোটি ২৩ লাখ ২১৯ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫১৮ টাকা; রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৪৮ টাকা; বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৬০ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৮৫ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬৪ টাকা; খুলনার সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯১ হাজার ৪৭২ টাকা; রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ২২ লাখ ২১ হাজার ৮৮৫ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯০ হাজার ৩৫৫ টাকা; ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৩৮ লাখ ৭৪২ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৪ টাকা; বাগেরহাটের সরকারি প্রফুল­ চন্দ্র কলেজে ছাত্র সংসদ খাতে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬০৪ টাকা এবং অন্যান্য খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯০ টাকা। তাছাড়া আরো কলেজেও বিপুল পরিমাণ অব্যয়িত টাকা রয়েছে।

Manual6 Ad Code

 

সূত্র আরো জানায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টাকাগুলো সবসময় খরচ করা সম্ভব না হওয়ায় কিছু অব্যয়িত অর্থ থেকে যায়। কিন্তু সরকার ওই টাকা নিয়ে নিলে ছোট স্কুল-কলেজগুলো বড় সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হঠাৎ যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টাকার প্রয়োজন হবে তখন টাকা থাকবে না। আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন সরকার থেকে টাকা আনতে পারবে না। তবে বড় স্কুল-কলেজগুলো আয় বেশি হওয়ায় তাদের ফান্ডে জমাও হয় বেশি টাকা। সেখানের একটা অংশ নিতে পারে সরকার। তাছাড়া ঢালাওভাবে টাকা না নিয়ে সরকার একটা পরিকল্পনা করে টাকা নিতে পারে।

 

এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অব্যয়িত টাকা জমাদানের বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। তাদের মতে, সরকার শিক্ষার্থীরভর্তি ও বেতন থেকে একটা অংশ পায় আর কলেজের ফান্ডে থাকে বাকিটা। ওই টাকার নয়ছয় করার কোনো সুযোগ নেই। যদিও কিছু খাতের টাকা ব্যয়ে বিলম্ব হয়। এক বছরের টাকা হয়তো পরের বছর খরচ হয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীর চাপে অনেক প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয়। পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানে আসবাবপত্র মেরামত, শিক্ষা সফর কিংবা অন্যান্য খাতেও হঠাৎ করে টাকা খরচ হয়। সরকার সব টাকা নিয়ে গেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়বে। বরং ছাত্রদের টাকা ছাত্রদের কল্যাণে ব্যয় করা যায় তা নিশ্চিত করা হোক। করোনা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে অনেক খাতের টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। সেজন্য টাকার অঙ্ক বড় হয়েছে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানা, যে টাকা নেয়া হয় তা ছাত্রদের কল্যাণেই খরচ হয়। তবে করোনা ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানসহ অন্যান্য কারণে কলেজের কিছু টাকা খরচ হয়নি। তাছাড়া কলেজে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখানোর জন্য একটি ডিজিটাল ফান্ড ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয় একটা থোক বরাদ্দ দিয়েছিল। ওই টাকা খরচ করা হয়নি। এখন সব টাকা সরকার চাচ্ছে। বিষয়টি বিবেচনার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে।

Manual4 Ad Code

এ প্রসঙ্গে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, টাকা নিয়ে একেকজন একেক রকম ভাবছে। সরকার ওই টাকা নেয়ার কথা ভাবলেও প্রতিষ্ঠান প্রধানরা না দেয়ার কথা ভাবছে। কারণ স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী বেশি থাকার কারণে জনবল কাঠামোর বাইরেও খণ্ডকালীন অনেক লোক নিয়োগ দিতে হয়। তাদের বেতন ওসব ফান্ড থেকে দিতে হয়। আবার অনেক খাতে হঠাৎ করে ব্যয় করা প্রয়োজন হয়। ফলে সরকার টাকা নিয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকটে পড়তে হবে। বরং সরকার টাকা না নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটা নীতিমালা করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে।

Manual8 Ad Code

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান জানান, নিয়ম হলো প্রতি বছরের অব্যয়িত টাকা প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে ওই টাকা জমা দেয়া হচ্ছে না। সেজন্য অব্যয়িত টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য মাউশির মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেউ টাকা জমা না দিলে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code