

ডেস্ক রিপোর্ট: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর নীতিনির্ধারণে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে একে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে দ্য ল্যানসেট-এর এক প্রতিবেদন। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ৩১) সামনে রেখে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের দশম সংস্করণে ৩০টি দেশের ১৪৬ জন গবেষক অংশ নেন। এতে বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে তাপপ্রবাহের কারণে রেকর্ড ৭ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৭০ শতাংশেরও বেশি মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্বাস্থ্য ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা উদ্যোগ ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন’-এর নির্বাহী পরিচালক মারিনা রোমানেলো বলেন, ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গৃহীত হওয়ার পরের আট বছরে বিশ্বজুড়ে তাপজনিত কারণে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আট বছরে তাপজনিত কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা প্রায় ওয়েলসের পুরো জনসংখ্যার সমান।’ রোমানেলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর ৬৮ শতাংশের জন্য সরাসরি দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গৃহীত আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা চালানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব
রোমানেলো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে একের পর এক জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর শুধু সেগুলোর প্রতিক্রিয়া জানাতে না হয়। তিনি আরও বলেন, ‘এর পরিবর্তে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে দেশগুলোর দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হয় ও ভবিষ্যতে নতুন সংকট এড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়।’ মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে গবেষকেরা বিভিন্ন দেশের নথিভুক্ত তাপজনিত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে যত মানুষের মৃত্যু হতো, সেই সংখ্যা বাদ দিয়ে এর প্রকৃত প্রভাব নিরূপণ করেন বলে জানান সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অলি জে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহের মাত্রা ও ঘনত্ব—দুটিই বেড়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, গত বছর বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি স্থলভাগ অন্তত এক মাস ধরে তীব্র খরার কবলে ছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকা। এসব অঞ্চলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ ও ৩ দশমিক ২ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে হিসাব করা হয়েছে। ইউরোপে এ ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ০ দশমিক ২ শতাংশ এবং আমেরিকা মহাদেশে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ১৯৪টি সদস্যদেশের মধ্যে ৫৬টি দেশ চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস ও মোকাবিলার জন্য নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করেছে।
এদিকে, ২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বেড়ে ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগের দ্বিগুণ। জীবাশ্ম জ্বালানি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে বিশ্বে মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এর ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণে বছরে ২৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালের পর অন্তত ৭৭টি দেশে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ কমায় প্রায় ৩ লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা গবেষণায় অর্থায়ন ২০২৪ সালে বেড়ে ৩১৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় সাত গুণ বেশি। তবে এই অর্থের ৮৪ শতাংশই যাচ্ছে ধনী দেশগুলোর গবেষকদের কাছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো।