চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাজেট ভাবনা

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual2 Ad Code
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয় সপ্তাহব্যাপী শিল্প মেলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তারই সূত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল মিডিয়া বাজার হল, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল, বিষয়টি সবার কাছে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিও ছিল আশাব্যঞ্জক। আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছিল উৎপাদনশীলতা কী করে বাড়ানো যায়, মেশিনের ব্যবহারের গুরুত্ব অর্থাৎ টেকনোলজির ব্যবহার ও আয় বাড়িয়ে কী করে অধিকতর নতুন খাতের সৃষ্টি এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দিকে নজর দেয়া যায়। এখানেই দেখা মিলল অটো ইট প্রস্তুতকারী এক উদ্যোক্তার। তিনি জানালেন, তার ফ্যাক্টরিতে রোবটের ব্যবহার হচ্ছে এবং তার এ রোবট খুব ভালো কাজ করছে। এতে তার উৎপাদন বেড়েছে।
তার একটি ফেজ সম্পূর্ণ করতে এখনো ১৩ ঘণ্টা সময় লাগে, ভবিষ্যতে এ সময় আরো কমে যাবে, সনাতন পদ্ধতিতে সময়ের প্রয়োজন অনেক বেশি। তার উৎপাদন দৈনিক এক-দেড় লাখ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগে তার ফ্যাক্টরিতে ৩০০ জন কর্মী কাজ করতেন, এখন সেখানে কাজ করছেন মাত্র ২৩ জন। এতে তার দক্ষতা বেড়েছে এবং লোকবল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ও বিড়ম্বনা কমেছে। দক্ষ লোকের নিয়োগ তার খরচ কিছুটা বাড়িয়েছে, কিন্তু আয় বাড়িয়ে তিনি তা পুষিয়ে নিতে চান।
তিনি ভালো করছেন এবং তাকে দেখে আরো অনেকে উৎসাহী হয়েছেন, যাতে হফম্যান ক্লিনের চেয়েও উন্নততর প্রযুক্তিতে তারা যেতে পারছেন। তবে তিনি সরকারের নীতিমালার কিছু বৈষম্যের কারণে সমস্যার মধ্যে রয়েছেন।
তার সঙ্গে একান্ত আলাপে জানা গেল, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য তাকে প্রচুর ব্যাংক লোন নিতে হয়েছে। এর সুদ গুনতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, অন্যদিকে রয়েছে করের বোঝা, যা দিয়ে তার সাহসিকতার খেসারত দিতে হচ্ছে। জানালেন, এক সেকশন অর্থাৎ ১ লাখ ৮ হাজার ঘনফুট আয়তনের এক চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটায় উৎপাদিত এবং বিক্রয়যোগ্য ইটের ওপর ২০১৮ সালের ৭ জুনের এক আদেশ অনুযায়ী, বার্ষিক মোট ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা মূসক প্রদান করতে হয়। অর্থাৎ বছরে তারা প্রায় ৩০ লাখ পিস ইট উৎপাদন করে প্রতিটি ইটের ওপর ভ্যাট দিচ্ছে শূন্য দশমিক ১৩ টাকা, কিন্তু আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত একই পরিমাণ ইটের জন্য তাকে শূন্য দশমিক ৪৮ টাকা হারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে। এ খাতে তার খরচ হচ্ছে ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ তাকে প্রায় তিন গুণ বেশি কর দিতে হচ্ছে। এ উদাহরণ অধিকতর আধুনিক টেকনোলজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি অনুৎসাহিতকরণের ইঙ্গিত দিতে পারে।
এছাড়া সরকারের আরেকটি আদেশে পরিবেশ রক্ষায় ফাঁপা ইট উৎপাদনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ৫০ ভাগ ফাঁপা ইট উৎপাদন করতে হবে। এ ইট তৈরিতে মাটির পরিমাণ কম দরকার হয়, ইট পোড়াতে জ্বালানিও কম দরকার হয়, তাই দুটিই পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক। এ ধরনের ইট প্রস্তুতের ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা থাকা প্রয়োজন। চীনা সরকার এক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে এবং শূন্য হারে কর প্রযোজ্য রেখেছে।
উল্লিখিত উদাহরণ দুটি থেকে নতুন টেকনোলজি উৎসাহিতকরণ এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পদসাশ্রয়ী পদ্ধতিতে উৎপাদন উৎসাহিতকরণে নীতির অভাব প্রতীয়মান। হতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেনি বা তথ্যগত সমস্যা রয়েছে, তবে এ কথা সঠিক যে, আমাদের সামনে এখন উন্নততর প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নীতিমালায় পরিবর্তনের সময় এসেছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উন্নত দেশগুলো তাদের পূর্ব ঐতিহ্য অর্থাৎ উৎপাদন খাতে তাদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে বিশেষ তত্পর। তারা সত্তরের দশক থেকে যেভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আউট সোর্স করেছে এবং পরিণামে এ দেশগুলোকে শিল্পায়িত হতে সাহায্য করেছে, যেমন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, হংকং প্রভৃতি দেশ। এখন সেক্ষেত্রে অফশোরিংয়ের পরিবর্তে তারা এখন রি-সোর্সিং প্রসেস শুরু করতে যাচ্ছে। আমরা এর প্রতিফলন এরই মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, অধিকতর প্রটেকশন প্রবণতা লক্ষণীয়। চীন ও আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ একটি উদাহরণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের বিষয়টি বারবার সামনে আসছে, এমনিতেই প্রায় ২০ লাখ যুবক-যুবতী প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে যোগ দিচ্ছে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খায় না, যে কারণে একটি বিশেষসংখ্যক কর্মপ্রত্যাশী দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে থাকে অথবা বিদেশে পাড়ি জমায় একটি সঠিক কর্মসংস্থানের জন্য, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের অড জব করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এরপর ভাগ্যে থাকলে একটি সঠিক চাকরি মেলে অথবা হতাশায় দিন দীর্ঘ হতে থাকে। কারণ বিদেশেও চাকরির সুযোগ কমে এসেছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সেবার পরিমাণ বৃদ্ধি ও টেকনোলজি ব্যবহারের ফলে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে যে বিষয়গুলো আমরা অনেক বেশি দেখতে পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে আরো বেশি দেখতে পাব, তার মধ্য অন্যতম হলো রোবটের ব্যবহার। ঘরবাড়ি পরিষ্কার থেকে শুরু করে যে কাজে অধিক মানুষের ব্যবহার প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে ইটভাটার উদাহরণের মিল রয়েছে। যে উদ্যোক্তা ৩০০ লোক দিয়ে তার ফ্যাক্টরি চালাতেন, তিনি এখন এর পরিমাণ কমিয়ে এনেছেন। এতে তার অনেক সাশ্রয় হয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর ধারা অব্যাহত থাকবে। স্মার্ট অটোমেশন বা স্মার্ট হোম আরেকটি এ ধরনের বিষয়। এছাড়া ব্লক চেইন, ন্যানো টেকনোলজি, বায়ো-ইনফরমেটিকস, ৬জি কমিউনিকেশন, কোয়ান্টাম টেকনোলজি, থ্রিডি প্রিন্টিং, রিনিউয়েবল এনার্জি, অ্যাডভান্সড অ্যানালাইটিকস, অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস ইত্যাদি ব্যবহার হবে। ক্রেতাদের পছন্দের টেকনোলজি ব্যবহার না করলে রফতানিতে প্রতিযোগী হওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে।
তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে পরিবর্তন এসেছে এবং নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অর্থাৎ নারী শ্রমিকের পরিবর্তে পুরুষ শ্রমিক বেশি মাত্রায় সুযোগ পাচ্ছেন। কারণ তারা নতুন টেকনোলজিতে দ্রুত শিক্ষিত হতে পারছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ৬০ ভাগ নারী কর্মরত, যেখানে আগে প্রায় ৯৮ শতাংশই ছিল নারী। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের সঙ্গে দক্ষতার একটি পরিপূর্ণ সমন্বয়ের বিশেষ প্রয়োজন, তা না হলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
দেখা যায়, আগামীতে যেসব কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে; যেমন ড্রোন অপারেটর, কনটেন্ট ও নলেজ ক্রিয়েটর, থ্রিডি ফ্যাব্রিকেটর, সিটিজেন সায়েন্টিস্ট, ব্লক চেইন, ইন্টারনেট অব থিংগস, রোবট মেরামত, বিট কয়েন ট্রেডার ও অডিটর, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ইত্যাদি। কারো মতে, সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে ট্রান্সপোর্টেশনের ক্ষেত্রে, ড্রাইভারবিহীন গাড়ি, ইলেকট্রিক ভেহিকল দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। দ্রুতগতিতে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ তৃতীয় শিল্পবিপ্লবে আমরা অনেকটা দেরিতে শুরু করেছি এবং এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।
এরই মধ্যে একটি ৪জি কৌশলের কথা বলা হয়েছে। সরকারের এটুআই প্রকল্প জাতীয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কৌশল তৈরির কথা চিন্তা করছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা, স্বাস্থ্য, ডায়াগনসিস, ভার্চুয়াল হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্স, ট্রান্সপোর্টেশন, জুডিশিয়ারি, কৃষি, লাইভস্টক, মত্স্য ইতাদি ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রসারের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। শুধু স্বাস্থ্যসেবার উদাহরণটি দেখলে বোঝা যায় আমরা কতটা পিছিয়ে। ২০১৫ সালের এক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে জনপ্রতি ডাক্তারের অনুপাত প্রতি ১৩ হাজার মানুষের জন্য একজন, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্ট্যান্ডার্ড হলো প্রতি ১ হাজার ৪০০ জনের জন্য একজন ডাক্তার। যে কারণে ডাক্তাররা রোগী দেখার সময় প্রতি জনের পেছনে সময় কম দেন। ভালো ডাক্তার হলে তো কথাই নেই! এই যখন পরিস্থিতি, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কাজে লাগিয়ে মানুষের জন্য সেবার মান এবং পরিধি বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টির প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ তাদের কৌশল তৈরি করেছে এবং সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো ২০৩৫-এর মধ্যে তাদের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ করার ক্ষেত্রে এ কৌশল কাজে লাগাবে। ভারতের এআই গ্যারেজ সবার জানা। কেউ বসে নেই গ্লোবাল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার ক্ষেত্রে! নীতিমালার পরিবর্তন বিশেষভাবে দরকার।
এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে অর্থাৎ নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করে ভোক্তার সুযোগ বাড়ানো এবং সেই সঙ্গে ব্যবসায়ের উন্নয়নের অপরিহার্য অঙ্গ হলো অটোমেশন। এর জন্য দরকার হবে অধিকতর দক্ষ জনশক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, যার মধ্যে শক্ত ও নরম দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবগুলোর জন্য পূর্বশর্ত হলো অর্থায়ন, গবেষণা ও সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা। দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সঠিক মান ধরে রাখার কোনো নীতি নেই। শিল্পপণ্যের স্ট্যান্ডার্ডের ক্ষেত্রে অনেক কথাবার্তা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান সংরক্ষণে মনোযোগ দেয়া হয়নি।
শুরুতেই যে উদাহরণটি দেখেছিলাম, এ রকম আরো উদ্যোক্তা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই অটোমেশন ও আধুনিকায়নের দিকে যাবে। শুনেছি, শুধু ব্রিকফিল্ডের ক্ষেত্রে আরো চার-পাঁচটি উদ্যোগ রোবট ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট, ইকোনমিক জোন ডেভেলপার ইত্যাদির প্রয়োজন ক্রমাগত বাড়বে, কাজেই এ খাতের আধুনিকায়নের জন্য সরকারের নীতিমালা বাস্তবভিত্তিক এবং উদ্যোক্তা সহায়ক হওয়া দরকার।
আগামী জুনেই নতুন বাজেট প্রণীত হতে যাচ্ছে, সেখানে প্রচলিত খাতের সঙ্গে সঙ্গে নতুন খাতকেও সুযোগ দিতে হবে এবং নীতিমালা এমনভাবে প্রণীত হতে হবে, যাতে সামনের দিনগুলোয় প্রতিযোগী হয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগ বেঁচে থাকতে পারে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, জাতীয় উৎপাদনশীলতা প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং একটি সঠিক ৪জি নীতি-কৌশল আমাদের অবিলম্বে সবার সামনে নিয়ে আসা দরকার। আগামী বাজেটে এ ব্যাপারে গবেষণা সম্পর্কিত বরাদ্দ রেখে উদীয়মান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার যথার্থ সময়।
লেখক: ফেরদৌস আরা বেগম, সিইও, বিল্ড
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code