

হাফিজার রহমান আদমদীঘি (বগুড়া) :
বগুড়ার আদমদীঘির ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল হতে পারে পর্যটক কেন্দ্র। সরকারী ভাবে পৃষ্টপোষকতার অভাবে আজও কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এই ঐতিহাসিক রক্তদহ বিলে। বহু ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব স্বাক্ষী এই রক্তদহ বিল। সতের শতাব্দির শেষের দিকে ফকির মজনু শাহ বগুড়ার আদমদীঘিসহ আশে পাশের এলাকায় ইংরেজদের দোসর জমিদারদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে তৎপরতা শুরু করেন। সেই সময় প্রজারা জমিদার ও ইংরেজদের দ্বারা প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক শারীরিক ও মানসিক ভাবে নির্যাতনের শিকার হতো। তাদের উপড় এমন ভাবে কর ধার্য করা হতো যা পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বশান্ত হতে হতো। ফলে প্রজারা বাধ্য হয়ে জমিদারদের নায়েব গোমস্তা এমনকি ইংরেজদের সাধারন সিপাহি ও কর্মচারীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত হারে সুদে টাকা কর্জ নেয়া ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। এ ভাবে প্রজাশোষন যখন চুড়ান্ত আকার ধারন করে ঠিক সেই সময় অথাৎ ১৭৮৬ সালে এই এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ন্যাসী সাথে নিয়ে ফকির মজনু শাহের আগমন ঘটে। সে সময় আদমদীঘির অধিকাংশ এলাকা ছিল গহিন অরণ্যবৃত জঙ্গল। ফকির মজনু শাহসহ তার দলবল অরণ্য থেকে বের হয়ে ইংরেজ শাসকদের ও এ দেশীয় দোসর জমিদারদের উপড় হামলা চালাতে শুরু করে। প্রজাদের সমর্থনে মজনু বাহিনীর অভিযানে ইংরেজ ও জমিদারদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় মজনু বাহিনী জমিদারদের নিকট থেকে নির্ধারিত চাঁদা আদায় করে গরীব প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তৎসময় বেশ কয়েক জন অত্যাচারি জমিদারকে অপহরণ করে আদমদীঘির কড়ই গহিন অরন্যে লুকিয়ে রেখে মুক্তিপন আদায় করে ছেড়ে দেয়া হতো বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। পরে কড়ই জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী মজনু শাহের ভয়ে ভীত হয়ে রাতের আধারে পালিয়ে ময়মনসিংহে আশ্রয় নেন। কথিত রয়েছে জমিদার ও ইংরেজ সরকার ফকির মজনু শাহের বাহিনীকে দমন করার জন্য সেনা নায়ক আইনশ্লাইনের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরন করেন। এই সংবাদ পাওয়ার পর দুধর্ষ ফকির মজনু শাহের বাহিনীর সদস্যরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে কড়ই জঙ্গল এলাকায় সমবেত হন। এদিকে ইংরেজ সৈন্যরা আত্রাই নদী হয়ে নৌকা যোগে সেকালের বিল ভোমরা আজকের ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল দিয়ে গোপনে কড়ই জঙ্গল ঘেরাও করে। তখন ফকির মজনু শাহের বাহিনী এগিয়ে এসে রক্তদহ বিলে তাদের বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধে। এই যুদ্ধে দুই পক্ষের বহু লোক হতাহত হলে রক্তদহ বিলের পানি রক্তের জোয়ারে লাল রং ধারন করে। সেই থেকেই বিল ভোমরার নাম করন হয় ঐতিহাসিক আজকের আদমদীঘির রক্তদহ বিল বা কোচমুনি দরগা। ওই যুদ্ধে ফকির মজনু শাহের শীর্ষ এক সহযোগী শহীদ হন। তার লাশ উক্ত বিলের মধ্যেই একটু উচু স্থানে দাফন করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি বটগাছ রয়েছে। আজও সেই বটগাছটি কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রক্তদহ বিলে। প্রবীন লোকদের মতে যত বড় বন্যা হোকনা কেন ওই বটগাছ ও কবরে কখনও পানি উঠেনা। ওই কোচমুনি দরগা বা বিল এলাকার বট গাছে বহু মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মানত করে থাকেন। অথচ এই ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল বা কোচমনি দরগা সংস্কারের অভাবে দিন দিন তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। এই রক্তদহ বিল ও কোচমুনি দরগা সরকারী উদ্যোগে সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষন করা হলে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। হতে পারে বিপুল সরকারি রাজস্ব আয়।