

ডেস্ক রিপোর্ট, ইউএসঃ দুই বছর সময় নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত চালিয়েও ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা ১৪টি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলার তদন্ত শেষ হয়নি এখনো। এ পর্যন্ত দুটি মামলায় চার্জশিট দিলেও সংশ্লিষ্ট আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে ঝুলে রয়েছে।
ব্যাংক খাতে বহুল আলোচিত এই দুর্নীতির ঘটনায় ২০১৮ সালে ফারমার্স ব্যাংকের অডিট ও ইসি কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ও তার ছেলে ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার রাশেদুল হক চিশতীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করে দুদক। এরমধ্যে রাশেদ চিশতীর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় পাঁচটি মামলা। করোনার সময়ে গত মাসে ১০ দিনের ব্যবধানে সবগুলো মামলায় জামিন নিয়েছেন তিনি। অবশ্য জামিন পাওয়া সবগুলো আদেশের বিরুদ্ধেই উচ্চ আদালতে আপিল করেছে দুদক। এরই মধ্যে দুটি মামলায় জামিন স্থগিতও করেছেন হাইকোর্ট। আজ মঙ্গলবার আপিল বিভাগের ভার্চুয়াল চেম্বার আদালতে এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, ২০১২ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয় নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে। অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম শুরুর পরই অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে ব্যাংকটি। আস্থার সংকট তৈরি হলে আমানতকারীদের অর্থ তোলার চাপ বাড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যাংকটির অডিট ও ইসি কমিটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে বাধ্য হন মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতি। পরিচালকের পদ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি। পরে বাবুল চিশতি ও ছেলে রাশেদ চিশতিসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যাংকারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটির জনবল নিয়োগ হয়েছে মূলত মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতির সুপারিশেই। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তারা নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া মাহবুবুল হক চিশতীর ছেলে রাশেদুল হক চিশতীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরসিএল প্লাস্টিকের সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহকদের অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যও বেরিয়ে আসে।
সূত্র মতে, দুদকের মামলায় রাশেদ চিশতি ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল থেকে কারাগারে আটক আছেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় চারটি এবং টাঙ্গাইলে একটি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে গত ১৮ ও ১৯ মে ঢাকার চারটি মামলায় এবং ২৭ মে টাঙ্গাইলের মামলায় জামিন পান তিনি। টাঙ্গাইলের ভার্চুয়াল আদালত দুদকের বক্তব্য না শুনেই রাশেদ চিশতির জামিন মঞ্জুর করেছে। এর বিরুদ্ধে দুদক হাইকোর্টে রিভিশনও দায়ের করে। গত ২ জুন ঐ জামিন বাতিল করে ফের টাঙ্গাইল আদালতে পুনঃশুনানির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
জানতে চাইল দুদকের আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশিদ আলম খান বলেন, ভার্চুয়াল আদালতের ফাঁকফোকরে তার জামিন হয়েছিল। আশা করছি, দুর্নীতির এত বড়ো মামলায় আসামিরা কোনো অবস্থাতে বের হয়ে যেতে পারবে না। আমরা আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করব।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বাবুল চিশতি ও রাশেদ চিশতি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে কৌশলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব টাকায় কেনা স্থাবর সম্পদের বাজারমূল্য ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। আদালতের নির্দেশে এসব সম্পত্তি এরই মধ্যে জব্দ করা হয়েছে। আসামিরা জামিন পেলে জব্দ করা সম্পত্তি বেহাত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আসামিরা করোনা পরিস্থিতির সুযোগটা নিলেও দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে তত্পর আছে। এরই মধ্যে দুটো মামলায় রাশিদুল হক চিশতির জামিন উচ্চ আদালতে স্থগিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা জামিনে বের হয়ে যেতে নানারকম চেষ্টা করছে। এজন্য রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে সবসময়ই হুঁশিয়ার থাকতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ফারমার্স ব্যাংকটি কিছু লোক দুর্নীতি করে ডুবিয়েছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এসব দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা উচিত। রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।