অপমৃত্যু নয়, স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রার্থনা।।

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual1 Ad Code

ইকবাল হাসান ফরিদ:- ১. জেদে পড়ে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। এরপর নেশা, নেশা থেকে পেশা। এ পেশায় দুই যুগের বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছি। বেশি বড়সড় দেহের অধিকারী না হওয়ায় অনেকটা আগের মতোই আছি। আয়ুস্কাল কমে আসছে দিনে দিনে, তবে দেহের বয়স যেন বাড়েনি। কমেছে শুধু মাথার চুল, বেড়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলি। প্রফেশনের অনেক জুনিয়র এখনো আমাকে নাম ধরেই ডাকেন। তারা আমাকে তাদের জুনিয়র মনে করেন। আমি তাতে আনন্দিত হই। বুঝতে না দিয়ে বড় ভাই বলেই সম্বোধন করি। আমার দেখা অনেকেই নানা লবিংয়ে ভাগ্যের উন্নতি করে অনেক বিত্তবৈভবের মালিক বনে গেছেন, আমার চেয়ে অনেক অনেক উচ্চ পদবীর পরিচয় বহন করছেন। তাদের সাফল্য দেখেও আমি আনন্দিত হই, মোটেও ঈর্ষান্বিত হইনা। কারণ আমাদের দেশে যারা তেলের নহর বসাতে পারেন, তাদেরই ভাগ্যের উন্নতি হয়, যোগ্যতায় অভিজ্ঞতায় ভাগ্যোন্নতি নগন্য।

Manual3 Ad Code

২. জন্ম আমার হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বড়কোটা গ্রামে। মধ্যবিত্ত পরিবারে মানুষ। স্বেচ্ছায় সাংবাদিকতায় এসেছি। বাবা মা এখনো চান সাংবাদিকতাটা ছেড়ে দেই। এই প্রফেশনে আমার কোন গুরু নেই। নেই পথ প্রদর্শক। নিজের পথ নিজেই নির্ধারণ করি। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেই। ঢোল পেটানো কম পছন্দ করি। চাপাবাজি করতে পারিনা। তবে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজধানীতে। হাটতে হাটতে পথ চিনেছি। নিজের যোগ্যতায় চাকরি করছি। ভাল না লাগলে ছেড়ে দিয়েছি, তবে এখনও চাকরিচ্যুত হওয়ার রেকর্ড নেই।

৩. অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা আমার ভাললাগা। অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে জীবনকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছি, আবার ঝুঁকিমুক্ত হয়েছি, তবে নীতি বিচ্ছুত হইনি। মেরে ফেলার ভয়, গুলি করে হত্যার ভয়, তুলে নিয়ে যাওয়ার ভয় আমাকে কাবু করতে পারেনি। অবৈধ প্রলোভন করতে পারেনি নীতিচ্যুত।

৪. এমনও দিন পার করতে হচ্ছে, সন্তানের দুধ না কিনে, সেই টাকায় মোটরসাইকেলের তেল কিনতে হয়। আর ডাল সবজিতো নিত্যদিনের সঙ্গী। লকডাউন পরিস্থিতির আগে এক ধনাঢ্য ব্যক্তি আমাকে একটি ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনারের দাওয়াত দিয়েছিলেন, হয়তো এর পেছনে তার বৃহৎ কোন স্বার্থ ছিল। আমি তার দাওয়াত প্রত্যাখান করেছি। বলেছি, আমি যা খাই, তা আপনার ওইখানে পাওয়া যাবে না। উত্তরে তিনি বললেন, তাহলে কোথায় বসতে চান, আপনার পছন্দ। আমি হেসে দিয়ে বললাম, আমি যেখানে বসে খাই, সেখানে বসার যোগ্যতা আপনার আগে ছিল কি না জানিনা, আর থাকলেও তা অনেক আগেই হারিয়েছেন, ভবিষ্যতে হয়তো এমন যোগ্যতা অর্জন করা আর সম্ভব হবে না। ভদ্রলোক প্রথমে না বুঝে একটু অপমানবোধ করেছিলেন। পরে হয়তো বিষয়টা পরিস্কার হয়েছেন।

৫. করোনাকালে কিছুদিন অফিসের নির্দেশনা ছিল বাসা থেকে সংবাদ পাঠানোর। একদিন আমাদের চীফ রিপোর্টার মাসুদ করিম ভাই ফোন দিয়ে একটা বিষয়ে ব্রিফ করলেন। বললেন, টিভিতে খবরগুলো দেখে নিও। মাসুদ ভাইয়ের কথায় মনে একটা বড় ধরণের ধাক্কা লাগলো। মাসুদ ভাইকে বললাম, আচ্ছা দেখে নিব। কিন্তু সত্য কথাটা চেপে গেলাম। বলিনি আমার বাসায় টিভি চালাই না। বললে হয়তো উনি সরলমনে বলতেন, তুমি যুগান্তরের ক্রাইম রিপোর্টার! তোমার বাসায় টিভি নেই? কিংবা আরও কোনকিছু বলতেন। আমি আবার কি থেকে কি বলে ফেলতাম…।

৬. একসময় একটা ছোট্ট পত্রিকায় চাকরি করতাম। বেতন হতো পরের মাসের ১০ তারিখে। বেতনের টাকায় সংসার চলে। একমাসে ১৫ তারিখ পেরিয়ে যাচ্ছে, বেতন হচ্ছে না। অফিসে গিয়ে অস্থির হয়ে গেছি। ওই কাগজের বার্তা বিভাগের প্রধান ডাকলেন, বললেন, ওই তুমি এত চিল্লাপাল্লা করছো। ক্রাইমবিটে কাজ করো তোমার কি টাকার অভাব! আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললেন, ডিএমপির ৩৩ থানার(তখন ডিএমপিতে ৩৩টি থানা ছিল) ওসিদের কাছ থেকে যদি ২ হাজার করে মাসে টাকা আন, তবে ৬৬ হাজার হয়ে যাবে…! উত্তরে একটু সাউট করে বলছিলাম, আপনারতো এখানেই শেষ। আমার স্বপ্ন কিন্তু অনেক উপরে। প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল। আল্লাহ হয়তো সেদিনের কথাগুলো কবুল করেছিলেন। আমি বর্তমানে কাজ করছি যুগান্তরের অপরাধ বিটে।

Manual7 Ad Code

৭. অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা করার কারণে সপ্তাহে কমপক্ষে দুইদিন মধ্যরাত পর্যন্ত অফিস করে বাসায় ফিরি। রাতটাকে নিজের কাছে দিনের মতোই মনে হয়। ভয় কাজ করেনা মনে। অামার একটা কমদামি ছোট মটরসাইকেল আছে। আমি খুবই নিয়ম করে মোটরসাইকেল চালাই। কখনো বেপরোয়া গতিতে চালানোর চেষ্টা করি না। সোমবার মধ্যরাতে অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলাম। রাত প্রায় দেড়টা। আগারগাও লিংক রোডটটা তখন নিস্তব্দ। ফাঁকা রাস্তায় লুকিং গ্লাসে দেখছিলাম পেছন থেকে একটি প্রাইভেটকার আসছে। আমি আমার মতো একসাইডে চলছি। আমার পাশে এসে প্রাইভেটকারটা এমনভাবে চাপ দিল। মনে হলো, আমাক পিষে ফেলবে। মোটরসাইকেলের গতি কম থাকায় ব্রেক কষে আমি ছিটকে পড়লাম। ডান উরুতে আঘাত লাগল। প্রাইভেটকারটা একটু স্লো করে আবার টান দিয়ে চলে গেল। আমাকে যে স্থানে এভাবে চাপা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে, এর পাশে সড়কে যে জায়গা আছে তাতে আরেকটা গাড়ি অতিক্রম করতে পারবে। কিন্তু এভাবে চাপ দিলো কেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

Manual2 Ad Code

জীবন যেমন সত্য, মৃত্যুও তেমনি অমোঘ। এটা মেনে নিয়েই মাঠে ঘাটে কাজ করছি। তবে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা একটাই আমার যেন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কখনো অস্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করি না।

লেখকঃ ক্রাইম রিপোর্টার, দৈনিক যুগান্তর।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code