

কামাল আহমেদ:- হবিগঞ্জ জেলার সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ, হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি, সাবেক পিপি, একজন স্কাউটার, একজন ক্রীড়া সংগঠক অ্যাডভোকেট মোঃ আমির হোসেন। তিনি একজন বহুগুণের অধিকারী কর্মবীর। ১২ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
অ্যাডভোকেট মোঃ আমির হোসেন চুনারুঘাট উপজেলার আহমদাবাদ ইউনিয়নের ছয়শ্রী গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৪৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোঃ মকবুল হোসেন ও মাতা কুসুম বানু। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে মোঃ আমির হোসেন ছিলেন দ্বিতীয়। তার বড় ভাই মোঃ জহুর হোসেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।
স্বাধীনতার পর হবিগঞ্জে প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে ১৯৭২ সালে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রথম কমিটি গঠন করা হলে আমির হোসেন হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত একটানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে পুণরায় কমিটি গঠিত হলে তিনি আবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৯০ সনে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি গঠিত হলে তিনি পুণরায় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রেসক্লাবের প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেন। ২০০২ সালে তিনি আবারও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এবং ২০০৬ সালে তিনি সাংবাদিকদের ব্যাপক সমর্থনে পুনরায় হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকদের স্বার্থ রক্ষায় এবং প্রেসক্লাবের উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। হবিগঞ্জের প্রথিতযশা সাংবাদিক মোঃ আমীর হোসেন ১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৬ বার সভাপতি নির্বাচিত হয়ে মোট ২৩ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে সততা, নিষ্ঠা ও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের ও সাংবাদিকদের মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে মোঃ আমীর হোসেন হবিগঞ্জ ফৌজদারী কোর্টে আইন পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে হবিগঞ্জ জজকোর্ট স্থাপিত হলে তিনি সংবাদিকতার পাশাপাশি হবিগঞ্জ জজকোর্টে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি বেশ কয়েক বছর চুনারুঘাট উপজেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে আমীর হোসেন হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ১৯৯৫ সালে তিনি বিপুল ভোটে জেলা আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে সমিতির প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেন। ২০০৭ সালে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে স্বনামধন্য অ্যাডভোকেট মোঃ আমীর হোসেনকে হবিগঞ্জ জেলা জজকোর্টে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ করা হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সততা ও সুনামের সাথে পিপি’র দায়িত্ব পালন করেন। আমির হোসেন হবিগঞ্জ মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, হবিগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং হবিগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। তিনি হবিগঞ্জ সুরবিতান ললিতকলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং হবিগঞ্জ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য। তিনি দীর্ঘদিন হবিগঞ্জ কোর্ট মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হবিগঞ্জ মুক্ত স্কাউটসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পরবর্তীতে এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হবিগঞ্জ জেলা স্কাউটসের সহকারী কমিশনার হিসেবে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম হবিগঞ্জের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন এবং হবিগঞ্জ জেলা প্রবীণ সংঘের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৮ সালে আইনজীবি হিসাবে হবিগঞ্জ বারে যোগদানের পর থেকে ৩৮ বছর যাবত তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
অ্যাডভোকেট মোঃ আমীর হোসেন ১৯৭৫ এবং ১৯৮৪ সালে ভারত সফর করেন।
তিনি বাংলাদেশ বেতারের হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি এবং দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি স্বরুপ জীবনে তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। সর্বশেষ সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘সোহাগ সাহিত্য গোষ্ঠী’ তাকে আইন পেশা ও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য স্বর্ণপদক প্রদান করে।
১৯৭৯ সালে অ্যাডভোকেট মোঃ আমীর হোসেন হবিগঞ্জ শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী মোঃ খুর্শেদ মিয়ার প্রথমা কন্যা রোকেয়া বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০১১ সালে স্ত্রী রোকেয়া বেগম সহ পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। আমির হোসেন ব্যক্তিগত জীবনের দুই কন্যা জিনাত আফজা রিপা ও নুসরাত আফজা রিনজন এবং এক পুত্র সন্তান মোঃ জুলফিকার হোসেন তানজিরের জনক। তার বড় মেয়ে জিনাত আফজা রিপা দর্শনে অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একমাত্র পুত্র জুলফিকার হোসেন তানজির ল’তে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে আমেরিকায় একটি ল’ফার্মে চাকুরিরত।
হবিগঞ্জের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ এডভোকেট আমির হোসেন ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি আমাদের চুনারুঘাটের একজন কৃতিমানুষ, আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের সন্তান।
লেখক:- কবি ও প্রাবন্ধিক
উপদেষ্টা সম্পাদক, শব্দকথা।