আগৈলঝাড়া স্বাবলম্বীর জন্য চাঁই বুননে কর্মমুখর

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

রুবিনা আজাদ, আগৈলঝাড়া (বরিশাল) :
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রতœপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের নাম মোহনকাঠী। এই মোহনকাঠী গ্রামটিই বরিশাল জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন ‘চাঁই পল্লী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই গ্রামের সকল বয়সী নারী ও পুরুষেরা এখন নিজেদের নিয়োজিত করেছেন মাছ ধরার চাঁই (ফাঁদ বিশেষ) তৈরীর কাজে। চাঁই বুননের মাধ্যমে অনেকের পরিবারেই ফিরে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা।

Manual3 Ad Code

গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাড়ির প্রত্যেকটি ঘরের শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে যুবক, যুবতী ও বয়োবৃদ্ধরাও সবাই ব্যস্ত চাঁই, বুচনা বুননে। কেউবা বুনন কাজে করছে সহযোগীতা। মোহনকাঠী গ্রামের কে বা কারা কবে প্রথম মাছ ধরার (ফাঁদ) চাঁই তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তার সঠিক কোন ইতিহাস কেউ বলতে না পারলেও গ্রামের প্রবীন ব্যক্তি মৃত নারায়ন বৈরাগীর ছেলে নলিনী বৈরাগী (৬৫) বলেন, তার বাবা ও ঠাকুর দাদাকেও চাঁই তৈরী করতে দেখেছেন তিনি। তার ধারণা, মোহনকাঠী গ্রামের চাঁই বুননের ইতিহাস প্রায় দু’শ’ বছরের পুরনো। পূর্ব পুরুষদের বংশ পরম্পরায় ওই পল্লীর বাসিন্দারা সবাই চাঁই-বুচনা বুননে এখন একেকজন দক্ষ কারিগর।

Manual3 Ad Code

তিনিসহ ওই গ্রামের মৃত হরলাল বৈদ্যর ছেলে নিবারন বৈদ্য জানান, বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও এই গ্রামের অন্তত দু’শতাধিক পরিবার এখনও বংশ পরম্পরায় ঐতিহ্যবাহী চাঁই তৈরির পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। চাঁই তৈরির প্রধান উপকরণ হচ্ছে বাঁশ ও বেত। তবে বেতের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে কৈয়া লতা নামে একটি লতা দিয়েও চাই তৈরী করা যায়। কৈয়া লতা বেশ শক্ত এবং পানিতে না পচার কারনে তা দিয়ে বেশ ভাল শক্ত চাঁই তৈরী করা যায়।

দেশের সমুদ্র ও পাহাড়ী এলাকা বিশেষ করে কুয়াকাটা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কাপ্তাইসহ পাহাড়ী অঞ্চল থেকে পাইকারেরা কৈয়ালতা ক্রয় করে এই এলাকায় নিয়ে আসেন। তাদের কাছ থেকে মুঠা প্রতি কৈয়া লতা দু’শ টাকা দরে কিনে রাখা হয়। ওই কৈয়া লতা দিয়ে তৈরী হয় চাঁই ও বুচনা। পানি বৃদ্ধি হলেই মাছ ধরার কাজে চাঁইয়ের কদর বাড়ে সর্বত্র। দু’শ টাকার তল্লা বাঁশ, দু’শ টাকার কৈয়ালতা দিয়ে একজন শ্রমিক দিনে ৪ থেকে ৫ খানা চাঁই বুনতে পারেন। তবে কৈয়া লতার সহজলভ্যতার পরিবর্তে চাঁই বুননে এখন প্লাষ্টিক সুতার ব্যববহারও করছেন কারিগররা। স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে তাদের ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য তাদের কাছে ২০ খানা চাঁই-বুচনা পাইকারি হিসেবে বিক্রি করতে হয় ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকায়। যার বাজার মূল্য আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।

চাঁই ও বুচনার প্রধান উপকরণ বাশ, বেত ও কৈয়া লতার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় চাঁই পল্লীর অনেকেই অর্থাভাবে স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে দাদন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা লোন করে চাঁই বানিয়ে ব্যবসা করলেও তাদের কিস্তির টাকা পরিশোধ করার পরে শ্রমিকদের লভ্যাংশর বড় একটি অংশ চলে যায় তাদের পকেটে।
এই গ্রামের চাঁই তৈরীর কারিগর মৃত রাই চরন বৈরাগীর ছেলে রমনী বৈরাগী (৫৫) জানান, সপ্তাহের শনি ও বুধবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাইকারেরা এসে তাদের তৈরিকৃত চাঁই কিনে নিয়ে যায়। এছাড়াও এই গ্রামের তৈরি করা চাঁই গোপালগঞ্জ, খুলনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, ভোলা, যশোর জেলাসহ ও দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাট-বাজারগুলোতে বিক্রি করা হয়।

Manual4 Ad Code

চাঁই তৈরীর কারিগর ওই গ্রামের নলিনী বৈরাগী জানান, এ গ্রামের অধিকাংশ লোকজন কৃষক ও নি¤œবিত্ত খেটে খাওয়া পরিবারের সদস্য। মৌসুমের প্রায় ছয় মাস জমি চাষাবাদ না থাকার কারনে গ্রামের পুরুষেরা বর্ষার মৌসুমে বাড়ি বসে চাঁই তৈরি ও চাষের মৗসুমে দিনমজুরের কাজ করেন। মোহনকাঠী গ্রামের তৈরি চাঁই বিক্রি হচ্ছে বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাগুলোতে।
চাঁই পল্লীর এই কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এই পল্লীর শ্রমিকেরা সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন।

Manual2 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code