আস্থার সংকটে শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা: অতীতের গৌরব, বর্তমানের গ্লানি

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

Manual5 Ad Code

 

সংগ্রাম দত্ত

সাংবাদিকতা সর্বত্রই একটি মহান ও শ্রদ্ধার পেশা। কিন্তু শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা আজ আস্থার গভীর সংকটে। একসময় যেখানে সাংবাদিকরা ছিলেন সত্য ও সততার প্রতীক, সেখানে আজ অসংখ্য অভিযোগ, কলঙ্ক আর অনিয়মের বেড়াজালে জর্জরিত এ পেশা। জনসাধারণও আর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছেন না সংবাদকর্মীদের ওপর।

Manual5 Ad Code

সোনালি অতীত: সম্মান ও নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত-

শ্রীমঙ্গলে সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে ষাটের দশকে। রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, বিপুল রঞ্জন চৌধুরী, কমলেশ ভট্টাচার্য, জহির উদ্দিন আহমেদ, রানা দেবরায়, গোপাল দেব চৌধুরী, সৈয়দ নেছার আহমেদ প্রমুখ ছিলেন সেই সময়ের অগ্রদূত।

স্বাধীনতার পর নতুন প্রজন্মের সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন আলফু মিয়া চৌধুরী, আব্দুল হাই চৌধুরী, এম এ সালাম চৌধুরী, মোহাম্মদ মহরম খান, মোঃ আব্দুল জলিল, মোহাম্মদ আলফু মিয়া চৌধুরী, মোঃ আব্দুল গাফফার, বিধূভূষণ পাল স্বপনসহ আরও অনেকে। ১৯৭৬ সালে তাদের উদ্যোগে কলেজ রোডে সরকারি ভেস্টেট প্রপার্টির জমি লিজ নিয়ে গড়ে ওঠে শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাব।

তখনকার সাংবাদিকদের সততা, আদর্শ ও বস্তুনিষ্ঠতা ছিল অনন্য। রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা লেখনীতে কখনো পক্ষপাতিত্ব করেননি। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের কারণে সমাজে সাংবাদিকরা ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়।

নব্বই পর্যন্ত ঐতিহ্য বজায়

আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও সততা ও পেশাদারিত্বের ধারা অব্যাহত ছিল। নিহারেন্দু হোম চৌধুরী সজল, সংগ্রাম দত্ত, সরওয়ার আহমদসহ তরুণ প্রজন্ম তখন যোগ দেন সাংবাদিকতায়। পরে বিশ্বজ্যেতি চৌধুরী বুলেট, আ ফ ম আব্দুল হাই ডনসহ কিছু তরুণ প্রমুখও সাংবাদিকতায় আসেন।

সেই সময় পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার মান ও ভাবমূর্তি ছিল অনেক উজ্জ্বল।

বর্তমান চিত্র: অবনতি আর অবিশ্বাস-

সময়ের প্রবাহে আজ শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা গুরুতর সংকটে।

অনেকে ন্যূনতম শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা ছাড়াই সাংবাদিকতায় নাম লিখিয়েছেন।

ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, জমি দখল, নারী ঘটিত ব্যবসা, বালু সিন্ডিকেট, এমনকি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও কিছু সংবাদকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিক সংগঠনে নেতৃত্ব দখল ও গ্রুপিং মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে।

বহিষ্কার–পাল্টা বহিষ্কার, আদালতে রিট পিটিশন, এমনকি নির্বাচন স্থগিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অডিও-ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

ফলে সাধারণ মানুষের চোখে সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ভেঙে পড়েছে।

সংকটের পেছনে কারণ-

বিশ্লেষকরা মনে করেন, কয়েকটি কারণে এই অবনতি ঘটেছে—

রুগ্ন রাজনীতি – সাংবাদিক সমাজকে প্রভাবিত করে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালীদের সাফাই গাওয়ানো হচ্ছে।

অবৈধ অর্থের প্রভাব – টাকার বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ বা গোপন রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

Manual3 Ad Code

সংগঠনের ভাঙন – প্রেস ক্লাবসহ সাংবাদিক সংগঠনগুলো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

যোগ্য সাংবাদিকের অনাগ্রহ – কলঙ্কিত চিত্রের কারণে শিক্ষিত ও আদর্শবান মানুষ এ পেশায় আর আসতে চাইছেন না।

পরিণতি: হারানো আস্থা-

অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের রাজপথে নামতে হয়েছে—যা জনঅসন্তোষের প্রকট রূপ। বর্তমানে সংবাদপত্র ও মিডিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

Manual8 Ad Code

করণীয়: আস্থা ফেরানোর লড়াই-

অভিজ্ঞ মহলের মতে, শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতা পুনরায় আস্থা ফিরে পেতে চাই—

নৈতিকতা ও সততার প্রতি সাংবাদিকদের অঙ্গীকার।

প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ।

সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।

অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

শিক্ষিত, মেধাবী ও তরুণদের সাংবাদিকতায় যুক্ত করতে উৎসাহ প্রদান।

শেষ কথা –

শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিকতার রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে তা আস্থার সংকটে জর্জরিত। যদি সততা ও পেশাদারিত্বে ফিরতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে এ পেশা আরও গভীর সংকটে পড়বে। সাংবাদিকতা যেন আবারও সমাজের আস্থা ও শ্রদ্ধার জায়গায় ফিরে আসতে পারে—এই প্রত্যাশাই আজ সর্বজনীন।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code