

মাইনুল ইসলাম রাজু
বরগুনার আমতলীতে বিএনপি নেতার ভাইয়ের জামায়াতে যোগদান করেছেন,আরেক দিকে মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি হয়েছেন আওয়ামী লীগের একনেতা। পৃথক এ দুই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরী হয়েছে।
জানা যায়, বরগুনার আমতলী উপজেলা জাতীয়তাবাদী যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক, বরগুনা জেলা কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও পৌর বিএনপির আহবায়ক কবির উদ্দিন ফকিরের ছোট ভাই জসিম উদ্দিন ফকির আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছেন।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) বেলা ১১টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমতলী মহিলা কলেজ রোডের কার্যালয়ে যোগদান অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর বরগুনা জেলা শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক এবং সূরা সদস্য মোহাম্মদ আবদুল মালেক, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মোঃ ইলিয়াস হোসাইন, উপজেলা সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন এর ফুল দিয়ে জসিম উদ্দিন ফকির আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামীতে যোগদান করেন।
যোগদান অনুষ্ঠানে উপজেলা ও ইউনিয়নের জামায়েতে ইসলামী নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।
যোগদান বিষয়ে জাতীয়তাবাদী যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক, বরগুনা জেলা কৃষক দলের সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিন ফকির বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। ইসলামের আদর্শ, সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে শরিক হওয়ার সুযোগ আল্লাহ তায়ালা আমাকে দিয়েছেন এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল বরগুনা জেলা শাখার কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সহ-সভাপতি, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাডঃ একেএম সামসুদ্দিন সানু ওরফে কমান্ডার সানু।
ওই কমিটির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বেশ হাস্যরস সৃষ্টি হয় ও বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কমিটিতে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকে সহ-সভাপতির পদ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাসহ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের উপজেলা কমিটির সদস্যরা। তবে বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক জানান, ভুল বশতঃ নামটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিগগিরই ওই কমিটি সংশোধন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বরগুনা জেলা জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল থেকে পদত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে যোগদান করেন বরগুনা জেলার কয়েক জন নেতা। এতে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল বরগুনা জেলার কয়েকটি পদ শূন্য হয়ে যায়। এই শূন্য পদ পূরণের জন্য নতুন করে জাতীয়তাবাদী দলের অনুসারী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে আবেদন করেন জেলা নেতৃবৃন্দ। পরে কেন্দ্রীয় কমিটি বরগুনা জেলার সংশোধিত কমিটি অনুমোদন দেয়। আর এতেই বাঁধে বিপত্তি।
মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সূত্র জানায়, বর্তমান জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (কাস্টমস নুরু) একজন বিতর্কিত ও পল্টিবাজ ব্যক্তি। যিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একেক সময় বিএনপি’র, একেক সময় আওয়ামী লীগের, একেক সময় স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন ও নির্বাচনী প্রচার- প্রচারনা এবং সভা-সমাবেশ পর্যন্ত অংশ নিয়েছেন। এমনকি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও তিনি নিজেও গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করে হাজারের উপড়ে ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।
সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম তালুকদার একজন বিতর্কিত ও ধান্দাবাজ ব্যক্তি হিসেবে অধিক পরিচিত। বিএনপি’র অনুসারী হিসেবে নিজেকে দাবী করলেও গত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী কোন আন্দোলন সংগ্রামে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটিও মামলা হামলার স্বীকার হননি। উল্টো প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষালম্বন করেছেন। গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর থেকে তিনি বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আবার রাজনীতিতে আর্বিভূত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধেও কমিটি বানিজ্য, বদলী বানিজ্য, শালিস বানিজ্যসহ বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে গিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিতে দপ্তর প্রধানদের ভয়ভীতি ও দেখে নেওয়ার হুমকি প্রদান করেন বলে একাধিক বীরমুক্তিযোদ্ধারা এমন অভিযোগ করেন।
আমতলী উপজেলা বিএনপি’র সিনিয়র নেতা বীরমুক্তিযোদ্ধা এবিএম সিদ্দিকীসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের এই দুই বিতর্কিত ব্যক্তিরাই (সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক) জেনেশুনে উৎকোচের বিনিময়ে চিহ্নিত আওয়ামী লীগের দোষরদের জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটির বিভিন্ন পদে অর্šÍভূক্ত করেছেন। তার বড় প্রমান আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সহ-সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাডঃ একেএম সামসুদ্দিন সানু ওরফে কমান্ডার সানুকে বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ দেয়া। এমনকি বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা দারুল ইসলামকেও জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের সহ-সভাপতি করা হয়েছে।
আমতলী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক জহিরুল ইসলাম (ভিপি মামুন) বলেন, বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার এবং বিব্রতকর। এটা কোনভাবেই এটা মেনে নেয়ার মত না। মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটির পদে থেকে চিহ্নিত আওয়ামী দোষরদের যারা ওই কমিটির মধ্যে অর্ন্তভূক্ত করেছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দাবি জানাই। আর দ্রুত জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল বরগুনা জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন করে প্রকৃত বিএনপিমনা বীরমুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জেলা কমিটি গঠনের জন্য অনুরোধ জানাই।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল বরগুনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা মাঠে না থাকায় এবং দলীয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আমরা অনেককেই চিনতে পারিনি। এ কারণে কমিটির সদস্য নির্বাচিত করতে ভুলবশত কমিটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম ঢুকে পড়েছে। আমরা শিগগিরই সেই নামগুলো বাদ দিয়ে কমিটি সংশোধন করব। তাকে প্রশ্ন করা হয় আপনি আমতলীর বীরমুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির সহ-সভাপতি অ্যাডঃ একেএম সামসুদ্দিন সানুকে (কমান্ডার সানু) চিনেন কিনা? সে কিভাবে বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটিতে সহ- সভাপতির পদ পেলেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি এড়িয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগগুলোসঠিকভাবে তিনি অস্বীকার করেন।
উল্লেখ্য গত ২০ আগস্ট তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ইসতিয়াক আজিজ উলফাত স্বাক্ষরিত এক পত্রে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট বরগুনা জেলার সংশোধিত কমিটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ওই কমিটির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বেশ হাস্যরস সৃষ্টি হয় ও বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।