

বিশেষ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত হাওর উপজেলা ইটনা। এই শান্ত-নিরিবিলি জনপদে হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে হামলার ঘটনায় গোটা এলাকা এখনো উত্তপ্ত। এ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে স্থানীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য এবং একটি ফুটবল টুর্নামেন্টকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিরোধ।
গ্রেপ্তার অভিযান
ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর শুক্রবার (২২ আগস্ট) গভীর রাতে র্যাব-১৪ এর একটি বিশেষ দল কিশোরগঞ্জ শহরের শোলাকিয়া বনানী মোড় এলাকায় অভিযান চালায়। সেখানে আটক করা হয় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আজাদুর রহমান সুজনকে (৩০)। র্যাব জানায়, হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি সুজন। এর আগে ইটনা থানা পুলিশ আব্দুন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে।
র্যাব-১৪ সিপিবি-২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লীডার আশরাফুল কবির বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যারা বাধা সৃষ্টি করেছে এবং সরকারি কর্মকর্তার বাসভবনে হামলা চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
হামলার সূচনা কোথায়?
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই কয়েকজন যুবক মিলে ইটনা মিনি স্টেডিয়ামে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। অভিযোগ ওঠে, খেলার আড়ালে সেখানে জুয়ার আসর বসছিল। এ বিষয়টি তদন্তে নিয়ে ইউএনও খেলা বন্ধের নির্দেশ দেন।
কিন্তু নির্দেশ অমান্য করে আয়োজকরা খেলা চালু রাখে। খেলা চলাকালে পুলিশের এক কর্মকর্তা মাঠে গিয়ে টুর্নামেন্ট বন্ধ করতে বললে দর্শক ও খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই দুই থেকে তিন শতাধিক মানুষ মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরে যায়। সেখান থেকে ইউএনওর বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে হামলা চালানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপরও হামলা
ঘটনার সময় ইউএনও বাসভবনে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা হয়। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছুটে আসা পুলিশকেও হামলার মুখে পড়তে হয়।
আনসার সদস্য মফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে সেদিন রাতে ইটনা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪২ জনের নামোল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত আরও প্রায় তিন শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
প্রশাসনের অবস্থান
ইটনা উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার উপর সরাসরি আঘাত।”
প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
ইটনার এই ঘটনা কেবল একটি স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক টানাপোড়েনও। টুর্নামেন্ট আয়োজনকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংগঠন ও প্রভাবশালী মহল নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিল বলে ধারণা স্থানীয়দের। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এই শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ইউএনওর বাসভবনে হামলার মধ্য দিয়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি
এখনো ইটনা ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পুলিশ ও র্যাবের টহল জোরদার করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় মানুষ এখনো আতঙ্কে থাকলেও প্রশাসন বলছে, এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।