ইহুদিদের ওপর নাৎসিদের চালানো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লাভ হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual5 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

জোরপূর্বক চিকিৎসা গবেষণা ও মানব পরীক্ষা হলো নাৎসি যুগের সবচেয়ে অন্ধকারতম অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম। এ সময়ে বিশেষ করে ইহুদি, যুদ্ধবন্দী, সিন্টি ও রোমা (ইউরোপের ভবঘুরে উপজাতি), প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও অন্যান্য নিপীড়িত গোষ্ঠীর ওপর রোগজীবাণু, বিষ ও ওষুধ পরীক্ষা করা হতো। তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপসারণ করা হতো, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঠান্ডায় ফেলে মারা হতো, জোরপূর্বক জীবাণুমুক্ত করা হতো এবং হত্যা করা হতো।

এ নৃশংসতার মাত্রা অকল্পনীয়, প্রায় কয়েক হাজার মানুষ এর শিকার হয়েছেন। বর্তমানে ১৬ হাজার মানুষের বিস্তারিত তথ্য অনলাইন ডেটাবেইসে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো, এখানে ভুক্তভোগীদের নাম, ব্যক্তিগত বিবরণ, তাঁদের ওপর চালানো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সুশৃঙ্খলভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ডেটাবেইসে আরও ১৩ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য রয়েছে, তবে তাঁদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে গবেষণা করা হয়নি।

এ ডেটাবেইস প্রকাশ করেছে লিওপোল্ডিনা অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি। এ প্রতিষ্ঠানের পূর্বসূরি কাইজার উইলহেল্ম সোসাইটির বিজ্ঞানীরা নাৎসি যুগে মানব নমুনার ওপর গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন।

দায়ী ব্যক্তিদের দায়মুক্তি ও যুদ্ধের পরবর্তী প্রভাব

Manual4 Ad Code

নাৎসি যুগে জার্মানি ও ইউরোপের ২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান চিকিৎসাসংক্রান্ত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ল্যানসেট কমিশন অন মেডিসিন, নাৎসিজম অ্যান্ড দ্য হলোকাস্টের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে এ নৃশংসতার পূর্ণ চিত্র উঠে আসে।

প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে, বিভিন্ন পদে থাকা চিকিৎসকেরা ‘জাতিগত’ পরিচয়ের দোহাই দিয়ে তাঁদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দিয়েছেন এবং বড়আকারে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, ইউথেনেশিয়া (ইচ্ছামৃত্যু) প্রোগ্রাম ও বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই অপরাধীদের মধ্যে মাত্র কয়েকজনকে তাঁদের কাজের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছিল।

কিছু বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের পরেও বাধাহীনভাবে তাদের কাজ চালিয়ে গেছে। ১৯৪৫ সালের পর নাৎসি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিনিধিরা, যেমন কাইজার উইলহেল্ম সোসাইটির সদস্যরা জার্মানিতে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ল্যানসেট কমিশন গঠনের মূল উদ্যোক্তা ভিয়েনা মেডিকেল ইউনিভার্সিটির মেডিকেল হিস্টোরিয়ান ড. হেরভিগ চেকের মতে, যেসব ব্যক্তি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের পরীক্ষা থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তাঁদের দক্ষতা পরে বিমান চলাচল ও নাসার মহাকাশ চিকিৎসা কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়।

গবেষণার ধারাবাহিকতা ও নৈতিক বিতর্ক

যুদ্ধের পরের সময়ে, নাৎসি শাসনের অধীনে সংগৃহীত কিছু ডেটা কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই গৃহীত হয়েছিল, কারণ, এসব পরীক্ষার পরিস্থিতি খুব কমই প্রকাশ হতো বা ডেটার উৎস গোপন রাখা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা, সালফোনামাইড অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা বা ফসজিন গ্যাসের প্রভাব সম্পর্কিত ডেটা, যা মানব পরীক্ষার মাধ্যমে এসেছিল, সেগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল এবং বারবার প্রকাশ করা হতো।

ফসজিন একপ্রকার বিষ, (শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে মৃত্যু হতে পারে), যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফ্লোরিয়ান শ্মাল্টজের আবিষ্কার অনুযায়ী, নাৎসিদের রাসায়নিক অস্ত্রের ওপর গবেষণার ফলাফল ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পুনরায় শুরু করা হয়েছিল।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সামাজিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রভাষক সাবিন হিল্ডেব্র্যান্ডট বলেন, ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার বিজ্ঞানীরা নাৎজভেইলার-স্ট্রুথফ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের ওপর ওটো বিকেনবাখের ফসজিন পরীক্ষার ফলাফলকে নতুন প্রাণী গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। সহকর্মীদের প্রতিবাদের পর সে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।

একটি বৈশ্বিক সমস্যা

Manual4 Ad Code

জোরপূর্বক চিকিৎসা গবেষণা ও মানব পরীক্ষা নাৎসি শাসনের অধীনেই উদ্ভাবিত হয়নি। এর আগে ও পরেও বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে, এমন চর্চা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব চর্চার কোনো সমালোচনা হয়নি বা খুব কমই হয়েছে।

হিল্ডেব্র্যান্ডট বলেন, মূলত এ কারণেই ল্যানসেট কমিশন গঠিত হয়েছিল। কারণ, নাৎসিবাদের অধীনে চিকিৎসাবিদ্যা ছিল অন্যায় শাসনের অধীনে চিকিৎসাবিষয়ক অনৈতিক গবেষণা।

Manual1 Ad Code

হিল্ডেব্র্যান্ডট আরও বলেন, বিভিন্ন দেশ ও সময়ের ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস রয়েছে। সেগুলোর গবেষণা করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রেও চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দাসত্বের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, যদিও বর্তমান সরকার সেগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করছে।

ডেস্ক: এস

Manual3 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code