উন্নত অবকাঠামোতে চিকিৎসার মান ধরে রাখা নিয়ে সংশয়

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ দেশে বড় বড় অনেক হাসপাতাল হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো-যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা উন্নত বিশ্বের মতো। কোনো কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের, যা বিশ্বের কোথাও নেই। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আদলে আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিশ্বের কোথাও নিউরোর এত বড় স্পেশালাইজড হাসপাতাল নেই। এছাড়া একই ধরনের দেশে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক শেখ হাসিনা ন্যাশনাল বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট।

বিশ্বমানের এই ইনস্টিটিউটটি বিশ্বের মধ্যে সর্ববৃহত্। বিশ্বের অনেক জায়গায় শুধু বার্ন ইউনিট আছে। মহাখালীর শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটটিও বিশ্বমানের বৃহত্ একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ইএনটি ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালও আন্তর্জাতিক মানের। দেশের সর্ববৃহত্ চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার বেডের অত্যাধুনিক জেনারেল হাসপাতাল করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, সব মিলিয়ে দেশে বর্তমান সরকারের আমলে চিকিত্সা সেবার অত্যাধুনিক অবকাঠামো হয়েছে অনেক। কিন্তু এটাকে ধরে রাখার মতো দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। একের পর এক প্লাস্টিক, নিউরো, গ্যাস্ট্রোএন্টোলজি, চক্ষু, কিডনি, হূদরোগসহ বিভিন্ন বিষয়ের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ প্রতি বছর অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু সেই হিসেবে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না।

এ কারণে প্রতি বছরই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যার ফলে রোগীরা সুচিকিত্সা থেকে এবং মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সুশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিত্সাসেবার ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। গঠিত মনিটরিং কমিটি অকার্যকর। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে আছে একশ্রেণির চিকিত্সকদের দলাদলি।

দেশের চিকিত্সা সেবার ক্ষেত্রে মনিটরিং কমিটি আছে ঠিকই, কিন্তু তা কাজীর গরু কেতাবের মতো। রাজধানী থেকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত হাসপাতালগুলোর চিকিত্সাসেবার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করার কমিটি আছে। উপজেলা পর্যায়ে কমিটির প্রধান হলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা। তার ওপরে আছেন জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন। তার নেতৃত্বে কমিটির পুরো জেলার স্বাস্থ্যসেবার মনিটরিং করার দায়িত্ব।

এর ওপরে আছেন বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য)-এর নেতৃত্বে কমিটি। এই কমিটির বিভাগ থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত সব হাসপাতালে চিকিত্সা সেবাসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করার দায়িত্ব। এদের ওপরে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল)। সারা বাংলাদেশে চিকিত্সা সেবার কার্যক্রমের তথ্য তার কাছে আছে এবং তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হয় না। বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলো কীভাবে চলে তার কিছুই মনিটর করা হয় না। রাজধানীর হাসপাতালগুলো সরাসরি মনিটরিং করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল)।

এছাড়া স্ব স্ব সংসদীয় আসনের এমপিদের নেতৃত্বে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন কমিটি আছে। দু-একটি কমিটি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও অন্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। কোনো প্রোগ্রাম থাকলে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আসেন শীর্ষ কর্মকর্তারা। এছাড়া তারা কখনো যান না। অনেক জায়গায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চরম আকার ধারণ করেছে।

Manual4 Ad Code

এসব দুর্নীতির টাকার ভাগ পান উপজেলা থেকে, সিভিল সার্জন অফিস, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) অফিস ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পর্যন্ত একশ্রেণির কর্মকর্তারা।  রাজধানীর ছয় হাসপাতালের পরিচালকরা বলেন, হাসপাতালগুলো কীভাবে চলে, কী ধরনের সমস্যা—তা যেন দেখার কেউ নেই। আমরা সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাবের পর প্রস্তাব পাঠাই। কিন্তু অধিকাংশ তা আলোর মুখ দেখে না। হাসপাতালে জনবলের তীব্র সংকট।  অন্যদিকে আছে চিকিত্সকদের মধ্যে দলাদলি। তাদের প্রভাবের কারণে চিকিত্সাসেবা বিঘ্নিত হয়। এসব চিকিত্সক সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না, রোগীরাও সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তারা জানান। তাদের কাছ থেকে দলবাজি ছাড়া কোনো সেবা আশা করা যায় না। কোনো কোনো পরিচালক আক্ষেপ করে এমন কথা বলেন।

সব সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য সেবার অব্যবস্থাপনা ছিল। দক্ষ জনবল না থাকলে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি চলবে কীভাবে? এগুলো রক্ষণাবেক্ষণও করবে কে? এ কারণে অনেক যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি থাকে। অপর দিকে চালু করার পরও দক্ষ জনবলের অভাবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে থাকে। এভাবে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অনেক হাসপাতালে অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে।

Manual8 Ad Code

হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। সব সরকারের আমলেই এই বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। চিকিত্সকদের সংগঠনগুলোর মধ্যে বিএমএ হলো জাতীয় সংগঠন। এছাড়া আওয়ামী লীগের আছে স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ (স্বাচিপ) ও বিএনপির আছে ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। সব সরকারের আমলে এই দুই সংগঠনের নেতাদের প্রভাব বেশি। তাদের প্রভাবে বিএমএর ভূমিকা প্রায় অকার্যকর থাকে। কাজে বাধা দেন, খবরদারি করেন। যে পদের উপযুক্ত নন, দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে সেই পদে বাগিয়ে নেন।

Manual4 Ad Code

সম্প্রতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএমএ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে স্বাচিপের নেতৃবৃন্দকে বলেছেন, ‘তোমরা তো দলাদলি করো, তোমাদের মধ্যে গ্রুপিং।’ সম্প্রতি নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও স্বাচিপের ছবি টাঙানো নিয়ে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জের ধরে হাসপাতালে স্বাচিপের কতিপয় নেতা পরিচালক অপারেশন করার সময় তাকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। নানাভাবে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। চিকিত্সকদের মধ্যে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। কতিপয় চিকিত্সক বলেন, আমরা কোথায় আসলাম? আমরা কোথায় কাজ করি? এটা কি চিকিত্সকদের কাজ? প্রায় হাসপাতালে স্বাচিপের এক শ্রেণির নেতাকর্মীদের দাপটে অনুরূপ পরিবেশ বিরাজ করছে।

অথচ স্বাচিপ নামধারী এসব চিকিত্সকরা হাসপাতালে নিয়মিত আসেন না, কাজও করেন না। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, নরসিংদিসহ ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে প্রাকটিস করা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তারা। স্বাচিপে আছে আবার দুই গ্রুপ। এ ব্যাপারে বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, এ ব্যাপারে আর কী বলব? স্বাচিপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন। স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, স্বাচিপের কোনো নেতার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করেছে বলে আমার জানা নেই। আমার কাছে কেউ কিছু বলেননি।

Manual5 Ad Code

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া বলেন, আমাদের লজিস্টিক সাপোর্ট বেড়েছে, জনবল কম আছে। তবে সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। সারা দেশে হাসপাতালে সঠিক নিয়মে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটা বিভিন্ন ধাপে মনিটরিং করা হচ্ছে। তিনি নিজে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর মনিটরিং করেন। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে টিএইচএফপিও, জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় পরিচালকরা (স্বাস্থ্য) মনিটরিং করেন। কোথাও কিছু হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন বলে তিনি জানান।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code