উন্নয়নে মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রেজাউল হক কৌশিক

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual2 Ad Code
ডেস্ক রিপোর্ট :: মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য একটি হলো মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আর দ্বিতীয়টি হলো, প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যেন বেশি টাকা বাজারে প্রবেশ করে মূল্যস্ফীতি বেড়ে না যায়। অর্থাত্ দেশের পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো মুদ্রানীতি। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ৬ মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পরবর্তী ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে তার একটি পরিকল্পনা থাকে মুদ্রানীতিতে।
গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। মুদ্রা ও অর্থনীতি কার্যক্রমের সামগ্রিক সফলতার প্রেক্ষাপটে নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হয়নি বলে জানান গভর্নর। নতুন মুদ্রানীতিতে রেপো ও রিভার্স রেপো সুদহার ৬ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতির গতিধারা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মুদ্রানীতিতে জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের ৮ দশমিক ৫ এবং ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে সংশোধন করে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯ ও ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে বলে জানান ফজলে কবির।
মুদ্রানীতিতে যেসব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। এ কঠিন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন তরান্বিত হবে। আগামী ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন কঠিন হবে এর অন্যতম কারণ হলো, বিনিয়োগ না বাড়া। কারণ, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আগ্রহ অনেক কম। এতদিন জাতীয় নির্বাচনের কারণে উদ্যোক্তা বসে ছিলেন যে, অবস্থা কোনদিকে যায় সেটা দেখার জন্য। এখন নির্বাচন শেষ হয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হয়ে সরকারের ধারাবাহিকতাও রক্ষা হয়েছে। তবে এখনো উদ্যোক্তাদের মধ্যে সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা বলছেন, বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ নেই। টাকা থাকলেই বিনিয়োগ করা যায় না। এজন্য সুষ্ঠু পরিবেশ দরকার হয়। এজন্য অবকাঠামো সুবিধা, সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসা সহজীকরণ করতে হবে। এ ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা দরকার। আমাদের দেশে এগুলোর বেশির ভাগই ঘাটতি রয়েছে। এজন্য বলা যায় যে, শুধু মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা ধরলেই ঋণ বাড়বে না। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ দিকে, খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে পদক্ষেপ জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। ব্যবসা করতে গেলে ঝুঁকি থাকবেই। আর অনেক ব্যবসায়ীই নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন ব্যাংকে ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েন। এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী আছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি (উইলফুল ডিফোল্টার) হয়। এ শ্রেণির ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত না দিয়ে বিদেশে পাচার করেন। যারা ব্যবসা করে লোকসানে পড়েন তাদের আবার পুনরুজ্জীবিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা ঋণের নামে লুটপাট করে তাদেরকে গ্রেফতার করতে হবে। আইনের আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার গঠন হওয়ার পর নতুন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থমন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি এজন্য কাজ করছে। খেলাপি ঋণ বিষয়ক নতুন নীতিমালা পাশ হলে খেলাপি ঋণ কমে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। ডলারের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডলারের দাম বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই। বরং অন্যান্য দেশের তুলনায় ডলারের বিপরীতে টাকা বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম খুব বেশি ওঠানামা করছে না। এটা নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
করপোরেট খাতের ব্যাংকনির্ভর মেয়াদি অর্থায়নকে কমানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে। সেখানে মূলধন বাজারে বন্ড ইস্যু করে অর্থায়নের দিকে মোড় ঘোরাতে প্রয়াস চলছে বলেও উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের মেয়াদি অর্থায়ন আহরণের সরলতর ক্রাউডফান্ডিং বিকল্পটির বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রবর্তন এখন সময়োচিত বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই একটি টেকসই বন্ডবাজার তৈরি করার কথা বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারও এ বিষয়ে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান তেমন কিছুই হয়নি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এ বিষয়ে কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। এঞ্জেল ফাইন্যান্সের জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটালের কথাও দীর্ঘদিন ধরে বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাংকিং খাতের উপর চাপ কিছুটা কমবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমানোর বিষয়ে গত বছর থেকেই সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়। আমানত ও ব্যাংক ঋণ সুদের হার ৬ ও ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করা জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সরকার থেকে বিভিন্ন ছাড়ও দেওয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সব ব্যাংক সে নির্দেশনা অনুযায়ী সুদহার কমায়নি। ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৪ ও ১৫ শতাংশ থাকলে কোনো ব্যবসায়ী তা নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। তাই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে হলে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমানোরও কোনো বিকল্প নেই। এসব বিষয় মোকাবিলা করে সামনে এগোতে পারলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়বে। তখন সরকার ঘোষিত জিডিপি লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code