

ওয়ালিউর রহমান মিরাজ,তালতলী (বরগুনা) :
বরগুনার প্রধান তিনটি নদী পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর যেখানে সাগরে মিশেছে ঠিক সেখানে নবগঠিত তালতলী উপজেলার নিশান বাডিয়া ইউনিয়নের স্নিগ্ধ বেলাভূমি“শুভ সন্ধ্যার” বিস্তীর্ণ বালুচরে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় জোছনা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে বৃহষ্পতিবার।
একদিকে সীমাহীন সাগর অপরদিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট টেংরাগিরি ও তিন কিলোমিটার জুডে দীর্ঘ ঝাউবন। তিন নদীর বিশাল জলমোহনা আরেকদিকে সীমাহীন সাগর। সব মিলিয়ে নদ-নদী আর বন-বনানীর এক অপরূপ সমাহার- “শুভ সন্ধ্যা সৈকত”।
প্রেম পিয়াসীর অপেক্ষায় খোলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝাউবন।তুমি আসবে তারই প্রতীক্ষায়, দক্ষিণের খোলা বাতাস ঝাউবন স্পর্শ করে যাচ্ছে পরম আবেশে খোলা বাতাসের ছোঁয়ায় প্রেমিকার উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ঝাউ গাছগুলো। জন্ম থেকেই সমুদ্রের খোলা বাতাস গায়ে মেখে ঝাউ গাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝাউ গাছের মাঝখানে শূন্য বালুরাশি। এ যেন দৃষ্টি নন্দন এক সৈকত! সমুদ্রের মৃদু ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউ বনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি যেন প্রকৃতি প্রেমের একটি উদাহরণ। এই প্রেমময় দৃশ্যপটের নাম- “শুভ সন্ধ্যা”। দক্ষিণে তাকালে অথৈ সাগরের ঢেউ আর ঢেউয়ের সথে দোল খেল মাছ ধরার ট্রলার ব্যাতীত আর কিছুই দেখা যাবেনা।
শহুরে সভ্যতায় হয়তো পেয়েছেন আপনি অনেক কিছু। কিন্তু হারিয়েছেন কী-কখনো কি ভেবে দেখেছেন! শ্রাবণের জলে সর্বাঙ্গ ভিজিয়েছেন কবে সর্বশেষ-মনেপডে! শরত-শিশিরে নগ্নপায়ে হেঁটেছেন কবে সেই স্মৃতি জানি ভুলেই গেছেন! মোম-জোছনায় চোখ-মন ভরানো হয়না কতকাল তা আপনার চেয়ে ভালো আর কে জানে! তাইতো এই আয়োজন, “জোছনা উৎসব”।
ত্রিমোহনার রূপালি জলরাশি ঘেঁষে বিস্তীর্ণ সৈকতে বসে হৈমন্তী পূর্ণিমা দেখে আপনি শিহরিত হবেনই। জোছনা পাগল হাজারো মানুষের সাথে গান, কবিতা, পুঁথি, জারি সারি শুনে/শুনিয়ে মুগ্ধ আপনাকে হতেই হবে। আসছে পূর্ণিমায় এখানেই জলজোছনায় একাকার হবে জোছনা বিলাসী লাখো মানুষ।অভিজ্ঞতা আর স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করতে প্রিয় স্বজনদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার “তালতলীর শুভসন্ধ্যা সৈকতে”, বরগুনায় জোছনা উৎসবে।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের স্নিগ্ধ বেলাভূমি“শুভ সন্ধ্যার”বিস্তীর্ণ বালুচরে পঞ্চমবারের মত এ উৎসবের আয়োজন করছেন জেলা প্রশাসন। এ উৎসব কে ঘিরে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় বরগুনার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে দেশ বিদেশের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে এ উৎসবে যোগ করা হয়েছে নানা আয়োজন। উৎসবকে ঘিরে ইতোমধেই শুভ সন্ধ্যা সৈকতে শুরু হয়েছে বাহারি পণ্যের পসরা সাজানোর প্র¯ুÍতি।
এখানে আসলে দেখা যাবে, সাগর পাড়ে সবুজের সমারোহে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও পাখির কুহুতান। মৃদু ঢেউয়ের ভালোবাসা পায়ে লাগিয়ে, স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে লাগিয়ে এখানে দাঁডিয়ে একেকটি গোধূলি সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার মুহূর্তটা কোনো পর্যটকের পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রকৃতি প্রেমের এমন লোভে পড়ে গেলে এই স্বর্গে যেতে মন চাইবে বারবার। শুধু সমুদ্র ভ্রমণ কিংবা সৈকতের বালুময় সৈকত দর্শনার্থীর মন ভরাবে তা নয়। সমুদ্রের পাশাপাশি আরো অনেক কিছু দেখার সুযোগ মিলবে এখানেএলেই।
শুভ সন্ধ্যার পাশেই আশারচরের অবস্থান। অসংখ্য মৎস্যজীবীর বসবাস এই চরে। আবার শীতের মৌসুমে পর্যটকরাও সেখানে যান। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, গভীর অরণ্য, বিশাল শুঁটকি পল্লী রয়েছে আশারচরে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষগুলো শুঁটকি উৎপাদনের জন্য এ চরটিতে ঘর বাঁধে। বছরে সাত থেকে আট মাস থাকে শুঁটকি উৎপাদনের ব্যস্ততা। “শুভ সন্ধ্যার”কাছেই রয়েছে তালতলীর বিশাল রাখাইন পল্লী। বঙ্গোপসাগরের তীরে এ পল্লী কুপি বাতি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁতের কাপড় বোনার কাজ। তাঁত শিল্প ছাড়া ওরাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির ও অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে।
আশারচরের শুঁটকি পল্লী, টেংরাগিরি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সোনা কাটাইকো পার্কের হরিণসহ বন্যপ্রাণী ইত্যাদি দেখার পাশাপাশি দেখা মেলে মৎসজীবীদের কর্মব্যস্ততা আর সৈকতের বুকে স্থানীয় শিশুদের উচ্ছ্বাস। এখানে নদী সমুদ্রের তাজা মাছ পাওয়া যায় ফকিরহাট বাজারের ছোট ছোট খাবারের হোটেলগুলোতে, যা পর্যটকদের পেট ভরাবে। এখানে খুব অল্প টাকায় খাওয়া যাবে মাছ ভাত বা গ্রামীণ স্থানীয় সব খাবার। এই সৈকতটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নবীন বিবেচনায় খাবার ও মাছের দাম তুলনামূলক সস্তা।
জোছনা উৎসবের উদ্যোক্তা সোহেল হাফিজ জানান, বন্ধুদের নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে যে উৎসবটি আমরা শুরু করেছিলাম তা আজ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের কাছে একটি প্রিয় উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং প্রতি বছর ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বরগুনায় পালিত হয়ে আসছে।