

ডেস্ক রিপোর্ট:বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বৈশ্বিক মঞ্চে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের পাশাপাশি মুদ্রিত বইগুলোর ডিজিটাল প্রকাশনার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করে তিনি বলেছেন, ‘ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা উচিত। সেজন্য আমি প্রকাশকদের অনুরোধ করব, এখন শুধু কাগজের প্রকাশক হলেই হবে না, ডিজিটাল প্রকাশক হতে হবে। এতে দেশে—বিদেশে সবার কাছে আমরা পৌঁছাতে পারব এবং অন্যান্য ভাষাভাষীও আমাদের সাহিত্য পড়বে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকালকার যুগে ছেলেমেয়েরা ট্যাবে করে বই পড়ে, আবার ল্যাপটপ বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের সাহায্যে পড়ে। যদিও আমরা তাতে মজা পাই না। একটি বই হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে পড়ার মধ্যে একটি আলাদা আনন্দ আছে।’
অনুবাদ সাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘একসময় দাবি উঠেছিল অনুবাদ করা যাবে না, কিন্তু আমি এর পক্ষে। অনুবাদ যদি না হয় পৃথিবীর এত ভাষা আমরা কোথা থেকে জানব? একটা দেশকে, তার সংস্কৃতিকে জানতে হলে তার ভাষার মধ্য দিয়ে জানতে হবে। আমাদের বাংলা ভাষা যত বেশি অনুবাদ হবে পৃথিবীর অন্যরাও তত বেশি জানতে পারবে।’
১৯৫২ সালে এ ফেব্রুয়ারি মাসেই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির সত্তা জাগ্রত হয়েছিল। সে ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ পথ বেয়েই আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। আমরা বাঙালি বাংলা ভাষায় কথা বলি, মায়ের ভাষায় কথা বলি, এ অধিকারটা আমরা পেয়েছিলাম। সেটাও আমাদের রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে। বাংলা একাডেমি আমাদের অনেক আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগার। বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই যে বদলেছে, সে কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা জানান, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে নিরাপত্তার বেড়াজালে তার বইমেলায় আসার আনন্দটাই হারিয়ে গেছে। বইমেলা প্রাঙ্গণে এলে ছোটবেলার কথা ও স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আসা, এতে কোনো মজা নেই। কারণ স্বাধীনতাই তো নেই। ডানে তাকাব নিরাপত্তা, বাঁয়ে তাকাব নিরাপত্তা, পেছনে গেলে নিরাপত্তা, সামনে নিরাপত্তা, এ নিরাপত্তার বেড়াজালে স্বাধীনতাটাই হারিয়ে গেছে। জানি না কবে আবার স্বাধীনতা পাব।’
বাংলা একাডেমির সভাপতি সেলিনা হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন ছোটন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। উদ্বোধন শেষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ভাষাশহীদ ও বঙ্গবন্ধুর স্মরণে বিভিন্ন ফটো গ্যালারি ও ডিজিটাল আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ফিতা কেটে বইমেলার উদ্বোধন করে বাংলা একাডেমি প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের স্টল ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্টল মাতৃভূমিতেও যান আওয়ামী লীগ সভাপতি।
প্রধানমন্ত্রী বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগৃহীত রচনা: দ্বিতীয় খণ্ড’ ও ‘প্রাণের মেলায় শেখ হাসিনা’ (বাংলা একাডেমিতে শেখ হাসিনার গত ২০ বারের ভাষণের সংকলন) শীর্ষক দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।
বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেলা ৩টার দিকে মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিচালনায় পরিবেশন করা হয় অমর একুশের গান। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও বিতরণ করেন। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য এ বছর ১১টি বিভাগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার—২০২৩ প্রদান করা হয়। বিভাগগুলো হলো কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ বা গবেষণা, অনুবাদ, নাটক, শিশুসাহিত্য বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, পরিবেশ বা বিজ্ঞান ক্ষেত্র, জীবনী ও লোককাহিনী।
পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন শামীম আজাদ (কবিতা), ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীর ও সালমা বাণী (কথাসাহিত্য), জুলফিকার মতিন (প্রবন্ধ বা গবেষণা), সালেহা চৌধুরী (অনুবাদ), নাট্যকার মৃত্তিকা চাকমা ও মাসুদ পথিক (যৌথভাবে নাটক ও নাট্যসাহিত্য), তপঙ্কর চক্রবর্তী (শিশুসাহিত্য), আফরোজা পারভিন ও আসাদুজ্জামান আসাদ (মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণা), সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ও মো. মজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধুর ওপর গবেষণা), পক্ষীবিদ ইনাম আল হক (পরিবেশ বা বিজ্ঞান ক্ষেত্র), ইসহাক খান (জীবনী) এবং তপন বাগচী ও সুমন কুমার দাস (যৌথভাবে লোককাহিনী)।
এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। সব মিলিয়ে বরাবরের মতো এবারো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বসেছে মাসব্যাপী এ আয়োজন। মেলায় ৬৩৫ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পেয়েছে ৯৩৭টি ইউনিট। এর মধ্যে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২০ প্রতিষ্ঠানকে ১৭৩টি ইউনিট ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭৬৪ ইউনিট বরাদ্দ পেয়েছে ৫১৫ প্রতিষ্ঠান।
এবার অধিবর্ষ হওয়ায় ১ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা প্রাঙ্গণ। তবে রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ আর প্রবেশ করতে পারবে না। আর ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। অবশ্য ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে মেলা। সুত্র:সাপ্তাহিক বাঙালিডটকম