

ডেস্ক নিউজ : ১০ই রমাদ্বানুল মুবারক উম্মুল মোমিনীন হাজরাত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর উরস মুবারক। আপনারা নিজ নিজ বাসায়, খানকাহ, মসজিদে তার স্মরণে ফাতেহা পাঠ করেন।
মাক্কাহ শরীফ এ হাজরাত খাদিজাতুল কোবরা রা. এর মাজার শরীফের ছবি যা ১৯২৫ এ ওহাবী সরকার শহীদ করে দে!
মানবজাতির মধ্যে চার শ্রেষ্ঠ নারীর মধ্যে অন্যতম হলেন এই মহীয়সী নারী। অন্য তিনজন হলেন নিজ কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা আলাহিস সালাম যিনি সব যুগের নারী জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ, হযরত মরিয়ম, ফেরাউনের স্ত্রী তথা মুসা আলাইহিস সালাম’র মাতৃতুল্য লালনকারী হযরত আসিয়া আলাইহিহুমুস সালাম।
উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলমান। নুর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র পেছনে সর্বপ্রথম যে দুই জন জামায়াতে নামাজ আদায় করেছেন তারা হলেন উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.)ও বালক আলী(আ.)। খাদিজা (রা.) মহান আল্লাহর এতটা নৈকট্য লাভ করেছিলেন যে যখন হযরত জিবরাইল (আ.) ওহী নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র কাছে নাজেল হতেন তখন তিনি প্রথমে মহান আল্লাহর সালাম পৌঁছে দিতেন এই মহীয়সী নারীর কাছে।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সঙ্গে বিবাহিত জীবনের ২৫ বছর কাটিয়েছেন মহীয়সী নারী হযরত খাদিজা (রা.)। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন মহানবী অন্য কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বিয়ের আগেও হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একত্ববাদী ও হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম’র ধর্মের অনুসারী এবং আরব জাতির মধ্যে সবচেয়ে ধনী মহিলা। হাজার হাজার উট তাঁর মালিকানাধীন বাণিজ্য-সম্ভার দেশ থেকে দেশে বহন করত বলে ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সঙ্গে বিয়ের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর (এ সময় তাঁর বয়স আরো কম ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন)।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সঙ্গে বিয়ের ১৫ বছর পর যখন মহান আল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর স্বামী’র নবুওত প্রকাশ করেন তখন থেকেই উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.) নিজের সব সম্পদ বিশ্বজনীন ধর্ম ইসলামের প্রচার-প্রসার ও নির্যাতিত নও-মুসলিমদের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতে থাকেন এবং ইসলামের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায় তাঁর সমস্ত সম্পদ। ফলে তাঁর ইন্তিকালের পর ইয়াতিম কন্যা ফাতিমা (আ.) একটি মুদ্রা পরিমাণ সম্পদও উত্তরাধিকারসূত্রে (মায়ের কাছ থেকে) লাভ করেননি।
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-কে বিয়ে করার কারণে মক্কার কাফির সম্প্রদায়ের মহিলারা বিবি খাদিজাকে বয়কট করেছিল। ফাতিমা (আ.)’র জন্মের প্রাক্কালে কাফির সম্প্রদায়ের অভিজাত মহিলারা তাঁর সেবার জন্য কোনো নারীকে পাঠায়নি। কিন্তু মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও কুদরতের ছায়ায় তিনি ফাতিমা (আ.)-কে প্রসবের সময় দেখতে পান যে তাঁর সেবা করার জন্য বেহেশত থেকে এসেছেন ইসহাকে (আ)’র মা বিবি সারা, ঈসা (আ)’র মা বিবি মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং হযরত মূসার বোন উম্মে কুলসুম। এ প্রসঙ্গে উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.) বলেছেন, ‘ফাতিমার জন্মগ্রহণের সময় সাহায্য করার জন্য আমি কুরাইশ নারীদের ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তারা এ বলে প্রত্যাখ্যান করল যে, আমি মুহাম্মাদকে বিয়ে করেছি। আমি কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম চারজন উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় দীর্ঘকায়া বিশিষ্ট নারী আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমাকে আতংকিত দেখে তাঁরা বললেন : হে খাদীজা! ভয় পাবেন না। আমি হলাম ইসহাকের মা সারা (হযরত ইব্রাহিম আ.’র স্ত্রী), আর অপর তিনজন হলেন ঈসার মা মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং মূসার বোন উম্মে কুলসুম। আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন আপনাকে সাহায্য করতে। এ বলে সেই জ্যোতির্ময় নারীরা আমার চারপাশ ঘিরে বসলেন। আমার মেয়ে ফাতিমা জন্মগ্রহণ করা পর্যন্ত তাঁরা আমার সেবা করলেন।’ কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন হযরত খাদিজা (সা. আ)’র গর্ভে ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে মা খাদিজা কথা বলেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে।
ইসলামের শৈশবে এর শত্রু কাফির-মুশরিকরা যখন মুসলমানদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ করে তখন শো’বে আবু তালিব উপত্যকায় দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়েছিল উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.)-কে।
ইসলাম প্রচারের প্রথম দিনগুলোতে যখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-কে নানাভাবে অপমান ও ঠাট্টা-বিদ্রূপের শিকার হতে হত এবং তাঁর মাথায় ছাই বা পশুর নাড়ীভুঁড়ি চাপানো থেকে শুরু করে দাঁত-মুবারক পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলেছিল শত্রুরা তখন সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী হিসেবে পাশে ছিলেন জীবন-সঙ্গী উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.)।
উম্মুল মু’মিনিন খাদিজা (রা.)’র পবিত্র স্মৃতি যখনই স্মরণে আসত মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র পবিত্র দু চোখ বেয়ে ঝরে পড়ত অশ্রুধারা। অন্য কোনো স্ত্রীই হযরত খাদিজা (রা.)’র সমকক্ষ নন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) খাদিজা (রা.) বান্ধবীদেরকেও শ্রদ্ধা করতেন।
একবার প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র কোনো এক স্ত্রী নিজেকে হযরত খাদিজা (রা.)’র চেয়ে উত্তম বলে দাবি করলে আল্লাহর রাসূল তাকে তিরস্কার করে বলেন: ‘আল্লাহর কসম, মহান আল্লাহ আমাকে তাঁর চেয়ে কোনো উত্তম স্ত্রী দান করেননি। তিনি আমার প্রতি তখনই ঈমান এনেছিলেন যখন অন্যরা আমাকে বিদ্রূপ করত, তিনি আমাকে তখনই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যখন অন্যরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি তার সম্পদ ব্যয় করেছেন আমার জন্য এবং তাঁর মাধ্যমেই আমি সেইসব সন্তানের অধিকারী হয়েছি যা অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে আমার জন্য নির্ধারিত হয়নি।’ (বুখারি শরিফ)
বলা হয়ে থাকে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র চারিত্রিক সুষমা ও মহানুভবতা, আলী (আ.)’র তরবারি এবং খাদিজা (রা.)’র অঢেল সম্পদ ছাড়া ইসলাম কখনও এতটা বিকশিত হতে পারত না।
যে বছর হযরত খাদিজা (রা.) ইন্তিকাল করেন সেই বছর ইন্তিকাল করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র প্রিয় চাচা ও অভিভাবক হযরত আবু তালিব(রা.)। তাই এ বছরটিকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল হোজন’ বা ‘দুঃখের বছর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে ।