বন্যাদুর্গতদের জন্য কিছু না লিখে পারছি না . . .

লেখক:
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual4 Ad Code

মাহফুজ আদনান : দেশ বন্যায় বিপর্যস্ত । মানুষের ভোগান্তি ও দুর্ভোগের যেন শেষ নেই । গেল মাস থেকে বন্যায় সিলেট বিভাগে হানা দিয়ে এখন দেশের পাচ বিভাগ পঙ্গু হয়ে আছে । সিলেট বিভাগের বন্যায় সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলাকে কুপোকাত করে স্বরণকালের ভয়াবহ বন্যা । প্রবাসীদের বিপুল পরিমাণ সহযোগিতাসহ দেশের মানুষজন অরেন সহযোগিতা করেছেন ।
এবারের বন্যায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা বন্যায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে ওই অঞ্চলের মানুষ। কেবল সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলাতেই ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। এর আগে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যায় একই অঞ্চলগুলো প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছিল। প্রায় ১২টির বেশি উপজেলা পানিতে তলিয়ে যায়। বিশাল জনপদ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ থাকায় টেলিযোগাযোগও প্রায় বন্ধ ছিল। রাস্তাঘাট পানির নিচে থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগও। ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার পরে এটিকে অঞ্চলগুলোর সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক বন্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায় । বেসামরিক প্রশাসন বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনিবলে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়। বন্যাকবলিত অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রয়োজন সাহায্য।


ভয়াবহ বন্যায় দেশের পাঁচ বিভাগের ১৫টি জেলার ৯৫টি উপজেলায় পশুসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবেই প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে ৬ হাজার ৫৬৯টি গবাদিপশুর খামার ক্ষতির মুখে পড়েছে। মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩২৮ কোটি ১৪ লাখ ৫১ হাজার ১৫০ টাকা। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ক্ষতিই হয়েছে সিলেটের চার জেলার ৩৪টি উপজেলায়। মঙ্গলবার (২৮ জুন) পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির সার-সংক্ষেপে দেখা যায়, বন্যায় পাঁচ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ সিলেট। তারপর যথাক্রমে রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও ঢাকা। তবে ক্ষতির পরিমাণের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, তারপর সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর। ঢাকা বিভাগের একটি জেলার ১০টি উপজেলায় ৪৬টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত খামারের সংখ্যা ২৫৮টি। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৮৯ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত গবাদিপশুর সংখ্যা, গরু ২ লাখ ২৫ হাজার ৭৬০টি, মহিষ ১৫০টি, ছাগল ৬৮০টি, ভেড়া ১৪৫টি, মুরগি ১৩ হাজার ১০০টি ও হাঁস ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬১টি।

এদিকে বন্যায় অনেকের গলা সমান পানিতে সীমাহীন কষ্ট করে একটু ত্রাণের আশায় ছুটে আসার দৃশ্য আমরা দেখেছি । অবর্ণনীয় দুর্দশাগ্রস্ত জীবন কাটিয়েছে বানভাসি মানুষ। তাদের দেখে মনে হয়েছে কত দিন, কত রাত বা কত যুগ তারা খেতে পায়নি। চোখগুলো ভেতরে চলে গেছে। না খেয়ে শরীর দুর্বল হয়ে গেছে। অনেকে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না।

সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যায় মানুষ হয়তো ভেসে যায়নি তবে বন্যার পানি তাদের সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যারা কোনোদিন অভাব দেখেনি আজ তারা খুবই অভাবী। যারা দু’হাত প্রশস্ত করে মানুষকে সাহায্য করত আজ তারাই সাহায্যপ্রার্থী। বন্যার পানিতে তাদের ঘরবাড়ি, হাড়ি-পাতিল, কাঁথা-বালিশ, কাপড়চোপড় সব গেছে। অনেকের পরনের কাপড় ছাড়া আর কোনো কাপড়ও নেই। এ দৃশ্য বন্যা উপদ্রুত সব জনপদের।

বন্যা দুর্গতদের সামান্য নয় অনেক বেশি সাহায্য প্রয়োজন । বিশুদ্ধ পানি নেই। চুলা নেই রান্না করে খাবার। চুলাই বা থাকবে কেমন করে যেখানে মানুষ থাকার জন্য এতটুকু মাটি নেই। একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী এই দুর্দশার বর্ণনা দিতে পারবেন, টেলিভিশনের পর্দায় দেখে এর বিন্দু পরিমাণ অনুভব করা যাবে না।

Manual3 Ad Code

এখানে কোনো রাজনীতি নেই, মানুষের জীবন বাঁচানোই একমাত্র কর্তব্য। কিন্তু কী আশ্চর্য! একদিকে বন্যাদুর্গত মানুষের বুকফাঁটা কান্না অন্যদিকে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে চলে উৎসব। মনে হয়েছে এই অসহায় মানুষগুলোর প্রতি সরকারের কোনো দায় নেই। পদ্মা সেতু দেশের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সেতুর চেয়ে কি মানুষের জীবনের মূল্য নেহায়েত কম? পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে শত শত টয়লেট নির্মাণ, হাজার হাজার বোতল পানিসহ খাদ্যের প্যাকেট, কোটি কোটি টাকার সাজসজ্জা মনে হচ্ছিল বানভাসি মানুষেদের সাথে চরম প্রহসন।

সম্প্রতি পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পায়রা, বিষখালী বলেশ্বরসহ শাখা নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানির নীচে তলিয়ে গেছে আউশের ধান ও আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে অর্ধ সহস্রাধিক পুকুর ও ঘেরের মাছ। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দুর্ভোগে পরেছে জেলার কয়েক লক্ষ মানুষ।

Manual6 Ad Code

জানা গেছে, পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪৩ সেন্টিমিটার বেশী পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের তেতুলবাড়িয়া গ্রামের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে তেতুলবাড়িয়া, গোরাপাড়া, খারাকান্দা, ছোনবুনিয়া, ফুলুপাড় ও নলবুনিয়া সাইক্লোন সেল্টারসহ ৮ গ্রাম ৪দিন ধরে প্রতিদিন দুবার করে জোয়ারের পানিতে ভাসছে।

এছাড়া উপকুলীয় আমতলী ও তালতলীর নদী তীরবর্তী অর্ধশতাধিক গ্রামও ৪দিন ধরে প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের বাইরের বসবাসরত মানুষের ঘরবাড়ী তলিয়ে গেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পরেছে আমতলী ও তালতলী উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। জোয়ারে পানিতে একাকার হয়ে আমতলী ও তালতলীর মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে। পানিতে নদী তীরবর্তী মাঠ-ঘাট তলিয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে আউশের ধান ক্ষেত ও আমনের বীজতলা। দ্রুত পানি না কমলে আউশ ধান ও আমনের বীজতলা পঁচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

এত ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি দেখে বসে থাকার সময় নেই । এগিয়ে আসুন এই অসহায় মানুষের জন্য । সংঘবদ্ধ হোন সহযোগিতার হাত বাড়ান । কেননা কবি বলেছেন, তুমি যদি পর দু:খে নি হও দু:খিত, মানব তোমার নাম না হওয়া উচিত ।

Manual6 Ad Code

লেখক : মাহফুজ আদনান, সম্পাদক, প্রকাশক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলানিউজইউএসডটকম ।

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code