

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: ২০০৯ সালে দিন বদলের ডাক দিয়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকেই বাংলাদেশের প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াত বেকায়দায় পড়ে। বলা চলে, নানা ইস্যুতে ক্রাকডাউন শুরু করে মাঠ পর্যায়ের রাজপথের শক্তিশালী দলটির ত্তপর। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের। পরে তাদের যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই মামলায় দলের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নেজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদসহ ৫ শীর্ষ নেতৃত্বের ফাঁসি কার্যকর করেছে সরকার।
মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান ও সংস্কার বিষয়ে জোট সরকারের সময়ে বিষয়টি চাউড় হয়ে উঠে। দলের তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সরকারে রেশানলের ভয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দলের তৎকালীন আমীরের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান। সংস্কারের পক্ষে বলয় তৈরি হয় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, মীর কাসেম আলী এবং মো. কামরুজ্জামানের হাত ধরে। এর সাথে শিবিরের সাবেক কয়েকজন সভাপতি ছিলেন। তবে কঠ্ররপন্থীদের চাপে সংস্কারপন্থীরা নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন বিষয়টি চাপা পড়ে ছিল। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারত্ত সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসে। শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেলকে শিশির মনিরকে বাদ দেয়াকে কেন্দ্র করে তুলকালাম সৃষ্টি হয়। মনির দলের একটি ফোরামে বলেছিলেন যে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আছে, তাদের সরে যেতে হবে, সরকার যদি চার, থেকে পাঁচজনের বিচার করে তাহলে করুক, এবং এত্ত বলেছিলেন যে, জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে শিবিরকে না জড়াতে। এসব কথায় তৎকালীন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল তার ত্তপর রুষ্ট হোন। মনিরকে ত্তই সময় জামায়াত ত্ত শিবিরের নেতাকর্মীরা ভিন্নদেশী গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসাবে আখ্যা দেন। তার কর্মকান্ডের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যান।
এরপর দ্বিতীয় মেয়াদে তার আর সেক্রেটারি জেনারেলের মনোনায়ন দেয়া হয়নি। তাকে কেন বাদ দেয়া হলো এজন্য ত্তই সময়ের প্রভাবশালী ১৯ জন শিবিরের সেক্রেটারিয়েট মেম্বার পদত্যাগ করেন। ১৯ জন নেজামীর সরকার থেকে পাত্তয়া বাসা বনানীতে যান। কিন্তু, নেজামি তাদের সঙ্গে দেখা করেননি।
বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়ে থাকলেত্ত আবার ২০১৪ সালে এসে বিষয়টি আলোচনায় আসে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায় আদালতে। দল হিসাবে জামায়াত মূল দল থাকবে কী-না অথবা নতুন কোন দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটবে কী-না তা আলোচনা চলতে থাকে। ২০১৯ সালের ১৯ই ফেব্রুয়ারিতে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেন। তিনি দলের প্রতি অভিযোগ আনেন যে, জামায়াত ৭১ এর ইস্যুতে ক্ষমা না চেয়ে ভুল করেছে। তার পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মনজু। এসময় মনজুকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। এরপর মনজু নতুন দল খোলার বাপারে সক্রিয় হয়ে উঠেন। অবশ্য জামায়াত নেতাকর্মীদের ধারণা যে, মনজু আগে থেকেই নতুন দল তৈরি করা জন্য দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করে আসছিলেন।
নতুন দল খোলার ব্যাপারে মনজুকে তলে তলে সমর্থন দিয়েছেন লন্ডনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। গত জানুয়ারি মাসে লন্ডনে গেছেন মনজু। রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। বৈঠকের বিষয়ে মনুজ নিজেই সংবাদ মাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন। এরমধ্যে জনআঙ্খাকা নামে একটি আলাদা প্ল্যাটফরম তৈরি করেন মনজু। সেখানে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক পেশাজীবী নেতা সাবেক সচিব সোলাইমান চৌধুরী।
গত ২ই মে রাজধানীর বিজয়নগরে আমার বাংলাদেশ পার্টি নামে একটি আলাদা দলের জন্ম হয়। এর আহ্বাবায়ক হয়েছেন সাবেক সচিব জামায়াত থেকে পদত্যাগ করা সোলাইমান চৌধুরী ত্ত সাবেক শিবিরের সভাপতি মজিবুর রহমান মনজু। তার দল ঘোষনার ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্ক ছিল জামায়াতে ইসলামী। নতুন দলে কেউ যোগ দিতে পারেন কী-না তা নিয়ে তারা চিন্তায় ছিলেন। কে তার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন কী-না তা লোক মাধ্যমে এবং তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা নজরদারি রেখেছিলেন। আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে দলের হাইকম্যান্ডের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এজন্য যে, সংস্কার ইস্যুতে শিবিরের বেশ কয়েকজন সাবেক নেতা মুনজুর সঙ্গে ছিলেন। অবশেষে তারা তার নতুন দলে যোগ দেননি।
সেইদিনের দল ঘোষণার পাল্টা কাউন্টার হিসাবে জামায়াত সাঈদীর মুক্তির জন্য অনলাইনে মুভমেন্টের ঘোষণা দেন। বোদ্ধা মহল বুঝতে বাকি রইনি যে, ২ই মে কেন ত্তই কর্মসূচি হাতে নেয়া হল।
নতুন দলের ব্যাপারে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হল জাময়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কোন মন্তব্য করতে চাননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের এক নির্বাহী কমিটির সদস্য বাংলানিউজ ইউএসএকে বলেন, মনজুর শুরু থেকেই বিতর্কিত কর্মকান্ড করে আসছিলেন। তিনি নতুন দলের আগে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন।তার বিতর্কতি কর্মকান্ডের আগেই সতর্ক থাকার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু, তিনি কোন পাত্তা দেননি। পাশের একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা তাকে মদত দিতো বলে দলের কাছে তথ্য প্রমাণ আসে। এছাড়াত্ত রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্খার মদত তিনি পেতেন বলেত্ত অভিযোগ আসে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে কাছে। অবশেষে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তিনি আরত্ত জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জামায়াতের ত্তপর ক্রাকডাউন চালাচ্ছে। দলের আমীরসহ শীর্ষ ৫ নেতার ফাঁসি হয়েছে। দলের আত্মাধিক নেতা সাজা মাথায় নিয়ে গোলাম আজম কারাগারে মারা গেছেন। এছাড়াও আদালতের সাজা মাথায় নিয়ে সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা একেএম ইউসুফ ও নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আব্দুস সোবহান মারা গেছেন। আমৃত্যু কারাদন্ড নিয়ে কারাগারে আছেন মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী। সাজা কার্যকরের অপেক্ষায় আছেন দুর্দিনের কান্ডারি দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। একাধিকবার জেল খেটে বাইরে জামিনে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন নায়েবে আমীর নাজির আহমেদ। এরপরত্ত নেতৃত্বের কোন সংকট হয়নি। জামায়াতের তৃতীয় সাড়ির নেতারা দল চালানো এবং সকল রাজনৈতিক সিন্ধান্ত গ্রহণ করছেন। এতে সারাদেশের জামায়াত ত্ত শিবিরের নেতাকর্মীরা বর্তমান নেতৃত্বের ব্যাপারে আস্থা রেখেছে। মনজুর যে নতুন দল তৈরি করেছেন এতে জামায়াতে দল ভাঙ্গার যে তিনি ষড়যন্ত্র করেছেন তা ভেস্তে গেছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।