ওমিক্রন: আবিষ্কার যখন বিপদের কারণ

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রন আবিষ্কারের পর আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধরনটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে ঘোষণা করার পরপরই প্রথম উদ্যোগ নেয় যুক্তরাজ্য।

কথায় বলে, সব ভালো, ভালো নয়। সেই সত্যিটা যেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছে। তেমনি সব আবিষ্কারও যে ভালো নয়, তার প্রমাণ পাচ্ছে তারা। এর আগে ডেলটা রূপের আবিষ্কার হওয়ায় বদনাম কুড়িয়েছিল ভারত। আর করোনার শুরুটা চীনে হওয়ায় দেশটি একরকম বিপদেই পড়েছিল। মোটামুটি করোনার নতুন রূপ যেসব দেশে পাওয়া গেছে সেসব দেশই গত দুই বছর ধরে বিপদে পড়েছে। প্রথম দিকে করোনার নতুন ধরনের নাম দেশের নামেই হতো। কিন্তু ‘ভারতীয় ধরন’ যখন ভারতের সম্মানের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দেখা দিল তখন ভারত ভ্যারিয়েন্টের অন্য কোনো নাম দেওয়ার আবেদন জানায়। এরপর গ্রিক নামে ভ্যারিয়েন্টের নামকরণ করা হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া নতুন ধরন নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছিল। গত শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ধরনটিকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বা উদ্বেগজনক হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে। বি.১.১.৫২৯ ধরনটির নতুন নামকরণ করা হয়েছে ওমিক্রন।

দক্ষিণ আফ্রিকার সেন্টার ফর এপিডেমিক রেসপন্স অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক অধ্যাপক টুলিও ডি অলিভিয়েরা বলেন, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট মিউটেট করেছে ৫০ বার। এর স্পাইক প্রোটিন বদলেছে ৩০ বার। মানুষের দেহের মধ্যে ঢুকতে কোভিড ভাইরাস এই স্পাইক প্রোটিন ব্যবহার করে। আর করোনার টিকা সাধারণত এই স্পাইক প্রোটিনকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়।

Manual4 Ad Code

ভাইরাসের যে অংশটি প্রথম মানুষের দেহকোষের সঙ্গে সংযোগ ঘটায় তার নাম রিসেপ্টার বাইন্ডিং ডোমেইন। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট সেই রিসেপ্টার বাইন্ডিং ডোমেইনে মিউটেশন ঘটিয়েছে ১০ বার। সেই তুলনায় করোনার ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে এই পরিবর্তন হয়েছে মাত্র দুই বার।

Manual5 Ad Code

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই ধরনের মিউটেশন সম্ভবত রোগীর দেহের জীবাণু থেকে এসেছে, যিনি এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে পারেননি। দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়াজুলু-নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড লেসেলস বলেন, এই ভাইরাসটির সংক্রমণের ক্ষমতা শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেদ করার কিছু ক্ষমতাও সম্ভবত এর রয়েছে। কোভিডের অনেক ভ্যারিয়েন্ট গবেষণাগারে বিপজ্জনক বলে মনে হলেও পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ওমিক্রনের সংক্রমণ ততোটা গুরুতর নয়। এর ফলে স্বাদ বা গন্ধ হারায় না। সামান্য কাশি হয়। এক থেকে দুই দিন ক্লান্তি থাকে। এর বেশি কিছু নয়। আর টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের এই ধরনের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

Manual5 Ad Code

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষ দিকে ভারতে শনাক্ত হওয়া ডেলটা রূপ বিশ্বের ১৬৩ দেশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। আক্রান্ত বেশ কয়েক কোটি মানুষ। দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য দায়ী ছিল এই রূপ। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ওমিক্রনের পক্ষে ডেলটার পরিসংখ্যানকে ছোঁয়ার পূর্বাভাস নেই। কেবল মানবদেহের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নয়। ওমিক্রনকে লড়াই করতে হবে করোনা টিকার প্রতিরোধের বিরুদ্ধেও। ডেলটা ধরনের সংক্রমণের সময় বিশ্ব জুড়ে টিকাকরণের সংখ্যা ছিল অনেক কম। এখন টিকাকরণ অনেকটাই এগিয়েছে। ফলে ওমিক্রনের পরীক্ষা আরো কঠিন।

এছাড়া গত এক বছরে টিকা সংক্রান্ত গবেষণাও এগিয়েছে অনেকটা। ফাইজার ও বায়োএনটেকের মতো সংস্থা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, করোনা ভাইরাসের নয়া রূপ প্রতিরোধী টিকা তৈরির কাজ ৬ সপ্তাহের মধ্যে শুরু হবে। ১০০ দিনের মধ্যেই আসবে নতুন টিকা। সব মিলিয়ে এক বছর আগে ডেলটার ঢেউয়ের মোকাবিলার জন্য বিশ্ব যতটা প্রস্তুত ছিল, ওমিক্রন প্রতিরোধে প্রস্তুতি তার চেয়ে বেশি। আবার ডব্লিউএইচও দ্রুত উদ্বেগ জানিয়েছেন বলে অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন। যদিও এরও কারণ আছে। কারণ ডেলটা পাওয়ার পর ডব্লিউএইচও দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ায় সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল।

পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারটা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের হাত ধরেই হয়েছিল। পরে এর খারাপ ব্যবহারে তিনি নিজেই বলেছিলেন, আগে জানলে এই বোমা আবিষ্কারই করতাম না। ঠিক তেমনি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ওমিক্রন আবিষ্কারের পর আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধরনটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে ঘোষণা করার পরপরই প্রথম উদ্যোগ নেয় যুক্তরাজ্য। যাতায়াত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, ইসরাইল, কয়েকটি আরব দেশ এবং ইতালিও। তবে তাড়াহুড়া করে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পক্ষপাতি নয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত নির্ভর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ তাদের। পশ্চিমা দেশগুলোর আচরণের সমালোচনা করেছেন সাউথ আফ্রিকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জো ফাহলা। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি কিছু প্রতিক্রিয়া অন্যায্য ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের বিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে কিছু দেশের নেতৃত্ব বিশ্বব্যাপী এ সমস্যা মোকাবিলার জন্য কোনো বলির পাঠা খুঁজছিল এবং সেটাই তারা পেয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আক্ষেপ করে বলেছে, নতুন আবিষ্কারে যেখানে পুরস্কার পাওয়ার কথা, সেখানে কেবল তিরষ্কার নয়, রীতিমতো শাস্তি পাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

গত ১৬ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনা ভাইরাসের নতুন রূপে সংক্রমিতের সংখ্যা ছিল ৩০০-র কাছাকাছি। ২৫ নভেম্বর বেড়ে তা ১ হাজার ২০০ জনে পৌঁছায়। সংক্রমণ বৃদ্ধির এই হার উদ্বেগজনক। ওমিক্রন অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে বলে    ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইসরাইল, বতসোয়ানা ও হংকংয়ে ধরনটি শনাক্ত করা গেছে।

Manual1 Ad Code

নেদারল্যান্ডস জানিয়েছে, শুক্রবার সাউথ আফ্রিকা থেকে আগত দুইটি ফ্লাইটের ৬১ জন যাত্রীর করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাদেরকে এখন আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। চেক রিপাবলিক নামিবিয়া থেকে আগত একজনের শরীরে করোনার নতুন ধরন  শনাক্ত করেছে। সেটি ওমিক্রনের কিনা তা নিয়ে পরীক্ষা চলছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিস প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল জানিয়েছে, ইউরোপে করোনার নতুন এই ধরন ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code