করোনার জন্য প্রস্তুতি

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual6 Ad Code

বেশ কিছুদিন থেকেই আমরা করোনা ভাইরাসের কথা শুনে আসছিলাম। আমি বিষয়টাকে কতটুকু গুরুত্ব দেব, বুঝতে পারছিলাম না। সাংবাদিকেরা এক-দুই বার আমাকে করোনা ভাইরাস নিয়ে কী করা উচিত সেটা জিগ্যেস করেছে, আমি যথেষ্ট বিনয় সহকারে বলেছি—আমি এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই, কিছু একটা বলে ফেলা উচিত হবে না। জনস্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তারা কী বলেন, সেটাই আমাদের শোনা উচিত।

এরকম সময়ে আমার কাছে একটা গ্রাফ এসে পৌঁছেছে। এটি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যার একটা প্লট। বিভিন্ন দেশের তথ্য দেওয়া আছে এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সব দেশের রোগী বেড়ে যাওয়ার হার হুবহু এক। শুধু তা-ই নয়, ইতালির সঙ্গে তুলনা করে দেখানো হয়েছে পৃথিবীর কোন দেশ ইতালি থেকে কত দিন পিছিয়ে আছে এবং সেই দেশগুলোর অবস্থা কত দিনের ভেতর ইতালির জন্য ভয়াবহ হয়ে যাবে। আমি একটু বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছি, সত্যি সত্যি তাই ঘটতে শুরু করেছে। একটুখানি চিন্তা করার পর বুঝতে পেরেছি আসলেই তো এটাই ঘটার কথা। করোনা ভাইরাসটি অসম্ভব ছোঁয়াচে এবং তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক ছয় দিনের ভেতর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে—এভাবে বেড়ে যাওয়ার হারটার নাম ‘এক্সপোনেনশিয়াল’ বাংলায় জ্যামিতিক হার।

বিজ্ঞান করতে গিয়ে এই গাণিতিক প্রক্রিয়াটি আমাকে অসংখ্যবার ব্যবহার করতে হয়েছে, কিন্তু মজার ব্যাপার, সব সময়ই এটা ব্যবহার করা হয়েছে কমে যাওয়ার জন্য। যখনই গাণিতিক সমাধানে বেড়ে যাওয়ার সমাধান এসেছে, আমরা যুক্তি দিয়েছি, এটি বাস্তব সমাধান নয় এবং সেই সমাধানটিকে আক্ষরিক অর্থে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। এই প্রথমবার আমি বাস্তব জীবনে একটা উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি, যেটা ছুড়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না এবং আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে! এক্সপোনেনসিয়াল কিংবা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়া একটি খুবই বিপজ্জনক বিষয়। প্রথমে যখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হয়, তখন আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে এক-দুইটি রোগী পাওয়া যায়। তাদেরকে যদি ঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন করে সারিয়ে তুলে নেওয়া যায়, তাহলে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। একবার যদি কোনোভাবে এটা এক্সপোনেনসিয়াল বা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে তখন সেটাকে থামানোর কোনো উপায় নেই। শুধু চীন সেটা করতে পেরেছে, ইউরোপের কোনো দেশ পারেনি। সিঙ্গাপুর, তাইয়ান, হংকং এই দেশগুলো খুবই বুদ্ধিমানের মতো সময়মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে করোনা ভাইরাসকে জ্যামিতিক হারে বাড়তে দেয়নি। সারা পৃথিবীতে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দায়িত্বহীন দেশ হিসেবে পরিচিত হয়েছে, আমরা এখন আমাদের চোখের সামনে এই দুটি দেশকে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফল ভোগ করতে দেখব।

 

করোনা ভাইরাস এখন আর একটি দেশের সমস্যা নয়। এখন এটি সারা পৃথিবীর সমস্যা। সব দেশের করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা প্রতিদিনই তথ্যভান্ডারে জমা হচ্ছে এবং সবাই সেটা দেখতে পাচ্ছে। তবে একজন সত্যি সত্যি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কি না সেটা জানতে হলে একটা জটিল এবং খরচসাপেক্ষ পরীক্ষা করতে হয়। (খবরের কাগজে দেখেছি আমাদের দেশে এই পরীক্ষা করার উপযোগী কিট রয়েছে মাত্র হাজারখানেক) কাজেই এই দেশে এখন খুব ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব বলে মনে হয় না। তাই এই দেশের জন্য আমরা যে সংখ্যাটি দেখছি তার বাইরেও করোনা ভাইরাস আক্রান্ত কেউ আছে কি না সেটা নিয়েও একটু দুর্ভাবনা থেকে যায়। এই দুর্ভাবনাটা বিশেষ করে শুরু হয়েছে যখন আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনা ভাইরাসের উপসর্গ থাকা রোগী হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে কিংবা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা বিক্ষোভ করে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এই অবিবেচক মানুষেরা এবং তাদের আত্মীয়স্বজন দেশের কোনো একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্ফোরকের মতো করোনা ভাইরাসের রোগী জমা করে যাচ্ছেন কি না সেটি কে বলবে? সবার অজান্তে এ ধরনের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেটে। যখন সবাই ধরে নিয়েছে সেখানে মাত্র অল্প কয়েক জন করোনা আক্রান্ত রোগী, তখন আসলে সেখানে কয়েক হাজার মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বসে আছে। হঠাত্ করে অনেক মানুষ মারা যেতে শুরু করেছে।

Manual1 Ad Code

আমি এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই, তবে গণিত, বিজ্ঞান বা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো সংখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারি এবং সেটাই করার চেষ্টা করছি। গত কয়েক দিন এই বিষয়টি নিয়ে লেখাপড়া করে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি যে, ‘আমাদের কিছুই হবে না, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে’—এটা ভেবে নেওয়া মোটেও সঠিক নয়। আমাদের দেশ গরম এবং জলীয় বাষ্প বেশি, তাই এই দেশে করোনা ভাইরাস টিকতে পারে না, সেটা ভেবে নিশ্চিত থাকাও মনে হয় ঠিক হবে না; কারণ মালয়েশিয়ার তাপমাত্রা এবং জলীয় বাষ্পের পরিমাণ আমাদের দেশের মতোই; কিন্তু সেখানেও করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, সময়মতো সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও ‘হ্যান্ড সেনিটাইজার’ তৈরি করছে, সেটাও চমত্কার একটা ব্যাপার। একজন মানুষ বিদেশ থেকে এসে কোয়ারেন্টাইনে সময় না কাটিয়ে বাড়িতে চলে এসেছে, সেজন্য গ্রামের মানুষ তার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে সেটাও একটা ভালো লক্ষণ। বোঝা যাচ্ছে, মানুষ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটিগুলোও সময়মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অসংখ্য অনুষ্ঠান কোনো রকম ভাবাবেগ ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেটি অনেক বড়ো দায়িত্বশীল একটি ঘটনা। যেহেতু এই পৃথিবীতেই এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা বিদেশ থেকে আসছে, তাই সব ফ্লাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এই পৃথিবীতেই অনেক দেশ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তাই চাইলে আমরাও নিশ্চয়ই পারব।

Manual4 Ad Code

একটা ঘূর্ণিঝড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ তছনছ হয়ে যায় কিন্তু আমরা ঠিকই সেটা সামলে উঠে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাই। তবে ‘আমরা কিছুই করব না, নিজে নিজে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে’—সেটা কেউ যেন বিশ্বাস না করে। সামনের কয়েক সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়, এই সময়ে আমরা জাতি হিসেবে কতটুকু দায়িত্বশীল তার একটা প্রমাণ আমরা পেয়ে যাব।

Manual8 Ad Code

সারা পৃথিবী যখন একটা বিপদের সম্মুখীন তখন আমরা নিরাপদে থাকব, সেটা কেউ আশা করে না। তবে এই ভাইরাসে শতকরা আশি জনের উপসর্গ হয় খুবই সামান্য। বিশেষ করে অল্প বয়সি শিশুদের বিশেষ কোনো সমস্যা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। কাজেই আতঙ্কের কোনো বিষয় নেই, তবে অবশ্যই সতর্কতার এবং প্রস্তুতির বিষয় আছে। প্রস্তুতিটির কথা সবাই জানে, সেটি হচ্ছে সামাজিকভাবে নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলা।

আমরা জানি ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা ভাইরাস ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানকার একজন গবেষকের লেখা একটি অংশ এরকম :

করোনা ভাইরাস তোমার দিকে এগিয়ে আসছে। এটি ছুটে আসছে এক্সপোনেনসিয়াল গতিতে। প্রথমে ধীরে ধীরে তারপর হঠাত্ করে। এটি আর মাত্র কয়েক দিনের ব্যাপার, কিংবা বড়োজোর কয়েক সপ্তাহের। যখন এটি আসবে তখন তোমার হাসপাতাল ক্লিনিক থমকে যাবে। তোমার দেশের মানুষের তখন চিকিত্সা হবে হাসপাতালের মেঝেতে, করিডরে। অতি পরিশ্রমে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে যাবে ডাক্তার নার্স। অনেকে মারা যাবে। তাদেরকে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন দেবে এবং কাকে মারা যেতে দেবে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটি মাত্র উপায়, সেটা হচ্ছে আজকেই নিজেদের সামাজিকভাবে আলাদা করে ফেলা। আগামীকার থেকে নয়। আজকেই।

তার অর্থ হচ্ছে, যত বেশি মানুষকে সম্ভব ঘরের ভেতর রাখা। এখন থেকেই।

আমরা চাই, আমাদের অবস্থা যেন ইউরোপের মতো না হয়। আমরা যেন এই বিপর্যয় ঠিকভাবে কাটিয়ে উঠতে পারি।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code