করোনা মোকাবেলায় জার্মান অভিজ্ঞতা

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual1 Ad Code

করোনাভাইরাসের ভয়াবহ ছোবলে গোটা বিশ্ব আজ উদ্বিগ্ন ও বিপর্যস্ত। দেশে দেশে মৃত্যুর মিছিল দেখে বিশ্ববাসী এখন দিশেহারা। এ দুঃসময়ে বিশ্বের প্রতিথযশা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে প্রভাবশীল রাজনীতিক ও নীতিনির্ধারকরা কেমন জানি থমকে গেছেন।

Manual7 Ad Code

ইউরোপের কয়েকটি দেশ যেমন-ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সে এখন লকডাউন অবস্থা বিরাজ করছে। ইউরোপসহ বিশ্বের এ মহামারী অবস্থায় অন্যসব দেশকে অনুসরণ না করে জার্মানি অনুসরণ করছে তাদের নিজস্ব পন্থা। জার্মানির অভিজ্ঞতার আলোকে আমার কিছু ব্যক্তিগত শিক্ষণীয় তথ্য এখানে আলোকপাত করছি।

Manual1 Ad Code

 

জার্মানির ৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৫ হাজার লোকের কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। দেশটিতে এ ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে ১ হাজার ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশের তুলনায় অতি নগণ্য।

জার্মানিতে আক্রান্তের হারের চেয়ে মৃত্যুর হার অনেক কম কেন এমন প্রশ্নের জবাবে জার্মানির ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান ড্রসটেন বলেন, মৃত্যুহার এত কম হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে জার্মানিতে প্রচুর পরিমাণে করোনার ল্যাব টেস্ট করানো হচ্ছে।

Manual5 Ad Code

উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লে­খ করেন, গত এক সপ্তাহে জার্মানিতে অর্ধ মিলিয়ন অর্থাৎ ৫ লাখ করোনা টেস্ট করানো হয়েছে। এজন্য এখানে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম।

এ প্রসঙ্গে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি জার্মানির বন শহরের যে এলাকায় বাস করি সেখানকার একটি স্কুলের একজন শিক্ষকের করানো টেস্ট পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল বিধায় ওই স্কুলের ১৮৫ শিক্ষার্থী তাদের পুরো পরিবার এবং স্কুলের সব স্টাফের পরিবারসহ টেস্ট করানো হয়েছিল এবং সব ক’টি পরিবারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত লকডাউন অবস্থায় রাখা হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যায়ামাগার, নাইট ক্লাব ও রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এ অবস্থায় দেশটির প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ বাসায় বসে অফিসের কাজ করেছে। গণপরিবহনগুলো স্বাভাবিক হলে লোকজন কমে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

ড্রাইভারের নিরাপত্তার স্বার্থে বাসগুলোর সামনের দরজা লক করে দেয়া হয়েছে। সব ধরনের সভা-সমাবেশ, সামাজিক প্রোগ্রামগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ৫০ জনের বেশি লোক এক জায়গায় সমবেত হওয়া নিষিদ্ধ, দুজন লোকের বেশি একসঙ্গে চলাফেরা করা যাবে না এবং একজন মানুষ থেকে আরেকজনের দূরত্ব কমপক্ষে ১.৫ মিটারের বেশি বজায় রেখে কথোপকথন ও চলাফেরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সুপারশপগুলোতে কেনাকাটার জন্য সবাইকে নির্দিষ্ট ট্রলি ব্যবহার এবং একসঙ্গে দু’জনের বেশি প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখানে বিধিনিষেধগুলো খুব কঠোরভাবে আরোপ না করা হলেও সবাই নিজের দায়িত্ববোধ থেকে অধিক সতর্কতার সঙ্গে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড

চালিয়ে যাচ্ছে।

Manual2 Ad Code

উল্লে­খ্য, এখন পর্যন্ত আমি কোনো জার্মানকে মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস পরতে দেখিনি। এদের ধারণা অনুযায়ী, ভাইরাস কখনও বাতাসে ছড়ায় না, তারপর করোনাভাইরাসটি ওজনে একটু ভারি হওয়ায় এক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার খুব ফলপ্রসূ নয়। যেহেতু ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির সিক্রেশন ড্রপলেটের মাধ্যমে অন্য কাউকে সংক্রমণ করতে পারে, সেহেতু এখানে সামাজিক দূরত্ব তথা একজন মানুষ থেকে আরেকজনের কমপক্ষে ১.৫ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে।

প্রায় সব অফিস খোলা রাখা হয়েছে; কিন্তু কাজের ঘণ্টা নমনীয়। অফিসের প্রায় সব কাজ ই-মেইলে বা ফোনের মাধ্যমে করা যাচ্ছে। কিন্তু জরুরি কোনো কাজ অ্যাপয়নমেন্ট নিয়ে করতে হচ্ছে। বিভিন্ন অফিস, সুপারশপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের প্রধান দরজাগুলোর ওপর নোটিশে সবকিছুর নির্দেশনা দেয়া আছে। আর হাত ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমগুলোতে রাখা হয়েছে বিশেষ স্যানিটাইজার।

করোনা প্রতিরোধে জার্মানি মূলত তিনটি পন্থা অবলম্বন করেছে, তা হচ্ছে-অনুসন্ধান, আইসোলেশন আর রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা প্রদান। কোভিড-১৯ আক্রান্তে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক টেস্ট করানো, টেস্ট পজিটিভ হলে সেই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সম্ভাব্য সবার টেস্ট করানো হচ্ছে।

যাদের টেস্ট পজিটিভ হচ্ছে তাদের সম্পূর্ণরূপে আইসোলেশনে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাদের অবস্থা খুব ক্রিটিকাল তাদের হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। মৃদু উপসর্গ, এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তিরা প্রচুর পরিমাণ শারীরিক ব্যায়ামের দ্বারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ ভাইরাস প্রতিরোধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যেহেতেু ভাইরাসটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি, তাই জার্মানরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি সচেতনতাকেই এ মহামারীর হাত থেকে রক্ষার একমাত্র কৌশল হিসেবে অবলম্বন করেছে।

পরিশেষে জার্মানির অভিজ্ঞতা থেকে আমি যে বার্তাটি বাংলাদেশের সবাইকে দিতে চাই, সেটি হচ্ছে যেহেতু উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের বেশি বেশি টেস্ট করানোর সক্ষমতা নেই, তাই পুরোপুরি লকডাউন হতে পারে আমাদের সর্বোত্তম পন্থা।

সর্দি, জ্বর আর কাশি এ তিনটি উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালে না গিয়ে সম্পর্ণরূপে আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত। অন্যান্য প্রয়োজনীয় সতকর্তা অবলম্বনের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের প্রতিদিনের শারীরিক ব্যায়াম আর ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নেই।

মনে রাখবেন, করোনা মানেই মৃত্যু নয়, তাই গুজবে কান দিয়ে আতঙ্কিত হবেন না। সচেতনতাই এর একমাত্র সমাধান।

লেখক:মো. নূর-ই-আলম সিদ্দিকী

পিএইচডি ফেলো, ইউনিভিার্সিটি অব বন, জার্মানি; সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code