কান্না আর আতঙ্ক, লাশের শহর নিউইয়র্ক

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual7 Ad Code

বাংলানিউজইউএস: চারিদিকে অন্ধকার, কান্না আর আতঙ্ক। শুধুই দীর্ঘশ্বাস। এ যেন এক লাশের শহর। লাশের গন্ধে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে নিউইয়র্ক। সদা ব্যস্ত এই শহরের চেহারা একেবারে বদলে গেছে। চাপা আতঙ্কের মধ্যে শুধুই শোনা যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর স্বজন হারানোর কান্না।

করোনা মহামারীতে নিউইয়র্ক হাসপাতালগুলোতে যুদ্ধ ময়দানের অবস্থা বিরাজ করছে। স্রোতের মতো আসছে কোভিড-১৯ রোগী। কোথাও তিলধারণের ঠাঁই নেই। ফ্লোরে বা মেঝেতেও আর জায়গা হচ্ছে না। বারান্দাতেও উপচেপড়া ভিড়।

সেখানেই দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা। একসঙ্গে এত রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ডাক্তার-চিকিৎসক-নার্সরা। আইসিইউ-ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকট। ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য সরকার-প্রশাসনের কাছে কাকুকি-মিনতি করছেন চিকিৎসকরা।

Manual7 Ad Code

প্রতি মিনিটে মিনিটে মরছে মানুষ। আক্রান্ত হয়ে আসছে আর লাশ হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ। চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় মরতে দেখে কাঁদছে ডাক্তার-নার্স। নিউইয়র্ক এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। হার মানাচ্ছে হরর সিনেমাকেও

 

বিশ্বের রাজধানীখ্যাত নিউইয়র্কের করোনা পরিস্থিতিকে যুদ্ধাবস্থা বলে বর্ণনা করছেন মার্কিন চিকিৎসক-নার্সরা। রয়টার্স।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি করোনা রোগীর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এখন মহামারীর এপিসেন্টার তথা কেন্দ্রস্থল নিউইয়র্ক সিটি। ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে আগেই ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এখন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছে না।

হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিশৃঙ্খল অবস্থা। নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে ব্রুকডেল হসপিটাল মেডিকেল সেন্টার নামের একটি হাসপাতালের ভেতরের পরিস্থিতির একটি ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

সেখানে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না থাকায় মেঝের ওপরে শুয়ে কাতরাচ্ছে অসংখ্য রোগী। ৩৭০ শয্যার হাসপাতালটির সব শয্যাতেই রোগী। হাসপাতাল এলাকাকে ‘যুদ্ধ ময়দান’ বলে অভিহিত করছেন ডাক্তার-নার্সরাই।

অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে আইসিইউ ও কৃত্তিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র ভেন্টিলেটর। যেখানে দুই হাজার দরকার সেখানে আছে মাত্র দুইশ’ ভেন্টিলেটর। অতিরিক্ত রোগীদের সেবা দিতে নতুন করে আরও ভেন্টিলেটর ও মেডিকেল সরঞ্জামের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ডাক্তাররা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেও মেডিকেল সরঞ্জামের ঘাটতি বলে জানানো হয়েছে।

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি হাসপাতালের শিক্ষানবিশ নার্স ক্রিশ্চিয়ান ক্যালডেরন। আইসিইউ ইউনিটে রাতের শিফটে কাজ করেন তিনি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে করোনার রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি জানান, করোনাবিরোধী এ লড়াইয়ে নিজেকে তার একজন যোদ্ধা বলে মনে হচ্ছে।

হাসপাতালের নিজের অফিসের সামনেও ‘ওয়ারিয়র’ তথা যোদ্ধা শব্দটি লিখে রেখেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডের সামনেই যোদ্ধা শব্দটি লিখে রেখেছি। এ মুহূর্তে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা।’

তিনি জানান, হাসপাতালের সব চিকিৎসক-নার্স প্রতিদিন জরুরি যুদ্ধাবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনার রোগীদের বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি আমরা। তারপরও প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে।’

হাসপাতালের স্টাফরা মরদেহ টানতে টানতে ক্লান্ত। প্রত্যেকটা হাসপাতালেই এখন লাশের স্তূপ। করোনায় সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। গত এক শতাব্দীতেও নিউইয়র্কের মানুষ এতটা কঠিন সময় পার করেনি। কারও পরিবারে বাবা মারা গেছে, কারও মা, কারও ভাই-বোন।

শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে পরিবারের অন্য মানুষেরা। বৃদ্ধ রোগী বেশি হলেও আছে শিশু রোগীও। এসব শিশু শুধু ফেলফেল করে তাকিয়ে দেখছে। কিছু বলতে পারছে না।

নিউইয়র্কে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭৬,০৪৯ জন। মারা গেছেন ১,২৫০ জন। প্রতি মুহূর্তেই এ সংখ্যা বাড়ছে। নিউইয়র্কে বারোরকম দেশের মানুষের বসবাস। শুধু গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুই শতাধিক।

ইতিমধ্যে করোনার হানায় অনেক আগেই উৎপত্তিস্থল চীনকে ছাড়িয়ে আক্রান্তের তালিকায় লাখ ছাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের দেশে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ১১০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেছে ৯০৮ জনের। যা এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।

Manual3 Ad Code

করোনার হানায় দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে, সংক্রমিতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ২১৫ জনে।

 

Manual1 Ad Code

দেশটিতে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নিউইয়র্ক রাজ্য। গোটা দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীই এ অঙ্গরাজ্যের। বুধবার এ অঞ্চলে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৯১৭ জন। এ নিয়ে সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৯০১ জন। এদিন সেখানে মারা গেছেন আরও ৩১৯ জন। ফলে শুধু নিউ ইয়র্কেই মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১৯ জনে।

এ পর্যন্ত নিউইয়র্কে ৩৫ জনসহ যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনা ভাইরাসে। এরমধ্যে গত মঙ্গলবারই মারা গেছেন পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশি। একে একে পরিচিত মুখগুলো ছবি হয়ে যাওয়ায় ভীতসন্ত্রস্ত প্রবাসীরা। লকডাউন মেনে টানা ১০ দিন গৃহবন্দি থেকে স্বজন-পরিচিতজনদের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে অসহায়ের মত ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। প্রিয় মানুষকে শেষ শেষ বিদায়ও জানতে পারছে না।

এছাড়া জানা গেছে, বাংলাদেশি ডজন খানের চিকিৎসক নিজেরাই করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ চিকিৎসা নিচ্ছেন ঘরে, কেউ হাসপাতালে। এর মধ্যেই সুখবর হচ্ছে, কমিউনিটির পরিচিত চিকিৎসক আতাউল ওসমানী নিজ ক্লিনিক থেকে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন।

‘নিউইয়র্ক পুলিশের ৫ শতাধিক সদস্য করোনায় আক্রান্ত বলে জানা গেছে। অনেক পুলিশ সদস্য সেলফ আইসোলেশনের কথা বলে ছুটিতে আছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হলেও পুলিশ স্বল্পতায় প্রশাসন উদ্বিগ্ন। যদিও প্রয়োজনে সেন্ট্রাল পুলিশ দিয়ে সহায়তার কথা বলা হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশে অনেক বাংলাদেশি কাজ করেন। তাদেরও বেশ কয়েকজন আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছি।’

‘নিউইয়র্কের প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে একাধিক বাংলাদেশি ডাক্তার আছেন। তারা সেবা দিচ্ছেন, আক্রান্তও হচ্ছেন।’

নিউইয়র্কের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘নিউইয়র্কবাসীদের জন্য সবাইকে দোয়া করার অনুরোধ করছি। বাংলাদেশি আমেরিকান যারা আছেন তারা অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।’

Manual2 Ad Code

নিউইয়র্ক রাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর ভাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গভর্নর বলছেন, ‘আমাদের লড়াইয়ের লক্ষ্য দুটো। একটি হাসপাতালে, অন্যটি নগরবাসীকে ঘরে রাখার।’ নিউইয়র্কে জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে যাওয়া, সমাবেশে যোগ দেওয়া, পার্টির আয়োজন করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিউইয়র্কে করোনা ভাইরাসে মারা যাওয়া লোকজনের মরদেহ দেওয়া হয় না পরিবারকে। ফোনে সমাহিত করার স্থান জানাতে হয়। তারপর বেশ কিছু আইনি আনুষ্ঠানিকতার পর মৃতদেহকে সরাসরি কবরস্থানে পাঠানো হয়। বেশ দূরত্ব রেখে একান্ত কিছু স্বজন জানাজায় অংশ নেওয়া বা শেষ বিদায় জানানোর আয়োজনে থাকতে পারছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code