

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
কাপ্তাই হ্রদে আগের তুলনায় অনেকাংশে বৃদ্ধি পেেেয়ছে মৎস্য উৎপাদন। প্রতি বছর গড়ে রাজস্ব আয় হচ্ছে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত এই হ্রদ বর্তমানে শতভাগ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে এই মাছ। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের সবখানেই ভোক্তাদের মধ্যে এই মাছের জন্য রয়েছে অতি উচ্চ চাহিদা।
তবে সমগ্র হ্রদে পূর্বের তুলনায় অনেকগুন মাছের উৎপাদন বেড়ে গেলেও অনাকাঙ্কিতভাবে ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে চলেছে বড় মাছের (কার্প জাতীয়) উৎপাদন।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, হ্রদে মোট উৎপাদনের ৯১ শতাংশ ছোট মাছ, ৭ শতাংশ কার্প জাতীয় এবং অন্যান্য বড় প্রজাতির মাছ ২ শতাংশ।
বিএফডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছর কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য উৎপাদন হয়েছিল মোট ১২,৬৯৬ মেট্রিক টন এবং এতে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার উপরে। যার উৎপাদন দশ বছর পূর্বে অর্থাৎ ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে ছিল ৮৯৭০.৯৪ মে.টন এবং তখন রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা।
বর্তমানে হ্রদে মোট ৫৩ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা হচ্ছে এবং বিলুপ্ত প্রায় ২২ প্রজাতির মাছ।
বাণিজ্যিকভাবে আহরিত কাপর্ জাতীয় অর্থাৎ বড় প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে, রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, চিতল, বোয়াল, তেলাপিয়া, বড় আইর, বাঁচা, পাবদা, মাগুর, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প এবং বিগ হেড কার্প ইত্যাদি।
বাণিজ্যিকভাবে আহরিত ছোট প্রজাতির মাছ হচ্ছে-কালো টেংরা, সাদা টেংরা, বাচা, শিং মাছ, কৈ, কাজলি, চাপিলা, কেচকি, কুঁচোচিংড়ি, কাটা মলা, ছোট মলা, ছোট আইর, গজার, বাইন, ফলি, মহাশোল, কার্পিও, টাকি, বাঁশপাতা, বাটা, পুটি, পোয়া, ফাইস্যা, কাকিলা, বাতাসি, বাইল্যা, কাঁটা মাইল্যা, গুড়ামাউল্যা ইত্যাদি।
বিএফডিসি’র মতে বিভিন্ন কারনে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে যেমন মাছের প্রজনন মৌসুমে হ্রদের প্রধান ৪টি ব্রিডিং গ্রাউন্ড (কাচালং চ্যানেল, মাইনিমুখ, বরকল চ্যানেল, জগন্নাথছড়া, চেঙ্গী চ্যানেল, নানিয়াচর, বিলাইছড়ির রাইংখিয়ং চ্যানেল) নষ্ট হয়ে যাওয়া, নদীর তলদেশ পলিজমাট বেঁধে ভরাট হয়ে যাওয়া, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, হ্রদের নাব্যতা হ্রাস, নির্বিচারে বেশী বড় আকাড়ে কেচকি এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং মাছ ধরা বন্ধকালীন সময় হ্রদে অবৈধভাবে ডিম ওয়ালা মাছ ও পোনা মাছ শিকার ইত্যাদি ।
সাধারণত, বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ হ্রদে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এগুলো হচ্ছে বিএফডিসির নিজস্ব হ্যাচারীতে উৎপাদিত কার্প জাতীয় মাছের পোনা হ্রদে অবমুক্ত করা এবং নিজস্ব হ্যাচারীতে রেণু পোনা উৎপাদন করা।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর মোট ৪৫.৯২ মে.টন কার্প জাতীয় মাছের পোনা হ্রদে অবমুক্ত করা হয়েছিল। হ্রদে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রতি বছর এভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।
বর্তমানে হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন হ্রাসের যে সমস্ত কারন সমূহ রয়েছে সেসব থেকে উত্তোরণের জন্য অর্থাৎ কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সম্প্রতি রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সদস্য সচিব হচ্ছেন বিএফডিসির ব্যবস্থাপক, সদস্য জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনষ্টিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং একজন জেলেদের প্রতিনিধি।
ইতিমধ্যে, এ কমিটির মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেগুলির ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন বিএফডিসির ব্যবস্থাপক এবং বালাদেশ নৌ-বাহিনীর লে. কমান্ডার এম তৌহিদুল ইসলাম।
কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে হ্রদে মাছ ধরা বন্ধ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সকল প্রকার মাছের পোনা অবমুক্ত করা, বেশী বেশী রাক্ষুসে মাছের (চিতল ও শোল) পোনা ছাড়া যাতে করে ছোট প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধি বা উৎপাদন কমে বড় মাছের উৎপাদন বেড়ে যায়, আগামী ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাচকি জালের আকার ছোট করা অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ৭০০ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুটের মধ্যে রাখা, হ্রদ জুড়ে কাচকি জাল দিয়ে মাছ ধরার স্থান কমিয়ে আনা, হ্রদের তলদেশ থেকে গাছের “গুইত্যা” সড়ানো বন্ধ করা, কারেন্ট জালের ব্যবহার সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করা, নিজস্ব হ্যাচারীতে বেশী বেশী রেনু পোনা উৎপাদন করা, উন্নত প্রজাতির কার্প জাতীয় মাছের পোনা উৎপাদনের লক্ষ্যে হালদাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে মানসম্পন্ন মা মাছ সংগ্রহ করা এবং হ্রদে বিলুপ্ত প্রায় ২২ প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা ইত্যাদির কাজ বাস্তবায়ন চলছে।
বিলুপ্ত প্রায় ২২ প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে, সরপুঁটি, গোলডা চিংড়ি, ঘাউরা, বাঘাইরা, মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, সাদা ঘনিয়া, মাগুর, কার্পিও এবং কাকিলা ইত্যাদি।
অন্যদিকে, হ্রদে রাক্ষুসে মাছের পরিমাণও দিনদিন কমে যাচ্ছে। আজ থেকে ২০ বছর পূর্বে রাক্ষুসে মাছের পরিমাণ ছিল ৮-১০ শতাংশ যা বর্তমানে এর পরিমাণ ৪.৫ ভাগে দাঁড়িয়েছে বলে বিএফডিসি সূত্রে জানা গেছে।
মোট ৭২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ যেটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের অধীনে ১৯৬০ সালে বাঁধ দেওয়ার কারনে সুষ্টি হয়েছিল।
এই হ্রদটি সৃষ্টির পর থেকে ১৯৬৫-১৯৬৬ সাল অর্থবছর থেকে এতে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন শুরু করা হয়েছিল। তখন মাত্র ১২০৬.৬৩ মে. টন মাছ আহরণ করা হয়েছিল যেখানে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ লক্ষ টাকা।
মৎস্য উৎপাদন ও বংশ বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত (তিন মাস) হ্রদে মাছ শিকার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। যা বর্তমানে হ্রদে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহরে শেষে মাছ ধরা খুলে যাবে হ্রদে।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে হ্রদে তিন মাসের জন্য মাছ শিকার বন্ধ হওয়ার পর বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ২০০ টি মাছ ধরার নৌকা, ৫০-৬০ হাজার মিটার কারেন্ট ও সুতা জাল এবং ১ মেট্রিক টনের অধিক মাছ জব্দ করা হয়েছে বলে বিএফডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর মাছ মারা বন্ধকালীন সময়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার না করার জন্য জেলেদের প্রত্যেককে ভিজিএফ কার্ড এর মাধ্যমে ২০ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়ে থাকে। এবছরও মোট ২৫০৩১ জন জেলেকে এ ভিজিএফ এর আওতায় চাল দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএফডিসি’র ব্যবস্থাপক।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ মে.টন মাছ আহরণ করা হয়। তবে তিন মাস মাছ মারা বন্ধ খোলার প্রথম এক সপ্তাহ প্রতিদিন ৯০-১০০ মে.টন পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ।
রাঙ্গামাটি বিএফডিসি’র ব্যবস্থাপক এবং বালাদেশ নৌ-বাহিনীর লে. কমান্ডার এম তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন, মূলত: বিভিন্ন স্থানে হ্রদের তলদেশ পলিজমে ভরাট হওয়াার ফলে ন্যাচারাল ব্রিডিং গ্রাউন্ড নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। তাই সেসব স্থান পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ড্রেজিং করা খুবই জরুরী। সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে হ্রদে বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং এর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা অপরীহার্য্য বলে বলেছেন ব্যবস্থাপক।