নিউজ ডেস্কঃ ভিসির পদত্যাগ দাবিতে এবার প্রতীকী লাশ নিয়ে ক্যাম্পাসে কাফনের কাপড় পরিধান করে মৌন মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা। এসময় একজন শিক্ষার্থী কাফনের কাপড় পরে শুয়ে পড়েন সবার সামনে আর কিছু শিক্ষার্থী কাফনের কাপড় পরে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যান। পরবর্তীতে তারা প্রতীকী লাশ কাঁধে নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ না করায় দিন দিন সংকট বাড়ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি)।
পদত্যাগের দাবিতে গত বুধবার থেকে আমরণ অনশন চালিয়ে আসছেন ২৩ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ১৬ শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাদেরকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া হাসপাতাল ও মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া. শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে গণঅনশনের ডাক দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকট সমাধানের জন্য ও অন্ধকার দূরের জন্য গোলচত্বরে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন তারা। এদিকে, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনে বাইরের কারো ইন্ধন নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাছাড়া, তারা যেকোনো সময় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান। এদিকে, রাত সাড়ে ১১টায় শিক্ষার্থীরা মুক্তমঞ্চের সামনে ভিসির কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শনিবার বিকেল ৩টায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কাফনের কাপড় পরিধান করে মৌন মিছিল করেছে। প্রতীকী লাশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী এই মৌন মিছিল করে। প্রথমে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে কাফনের কাপড় পরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে। এ সময় একজন শিক্ষার্থী প্রতীকী লাশ হয়ে সামনে শুয়ে থাকে। পরবর্তীতে মৌন মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর থেকে শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেতনা-৭১ এর সামনে গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে প্রতীকী লাশটি কিছুক্ষণ রাখা হয়। পরবর্তীতে আবারও মিছিল শুরু হয়ে গোলচত্বরে এসে শেষ হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের এক দফা এক দাবি ‘ভিসি পদত্যাগ’। এই দাবিতে আমরা গত ২০ জানুয়ারি বুধবার দুপুর ৩টায় ২৪ জন শিক্ষার্থী অনশনে বসি। প্রায় ৭২ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও আমাদের দাবি মেনে নেয়া হয়নি। তাদের স্বাস্থ্য ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমরা আমাদের সহযোদ্ধাদের কোনোভাবেই একা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারি না। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন আমাদের এই এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলনের মঞ্চ থেকে এক পা-ও নড়ব না।
এদিকে, আমরণ অনশনের পর গণঅনশনের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। শনিবার রাত ৭টায় গোলচত্বরে সংবাদ সম্মেলন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের পক্ষে ইয়াসির সরকার এই কথা বলেন। তিনি বলেন, ২৩ শিক্ষার্থীর আমরণ অনশনের ৭৫ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও ভিসি পদত্যাগ না করায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর সাথে লড়তে দেখে গণঅনশনে বসার সংকল্প নিয়েছেন। ভিসির পদত্যাগপত্র স্বচক্ষে না দেখা পর্যন্ত অনশন চলবে। গণঅনশন রাত ৮টা থেকে শুরু হবে। যে কেউ গণঅনশনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ইতোমধ্যে ইফতেখার আল মাহমুদ, সামিরা ফারজানা ও সামিউল এহসান শাকিল নামে তিনজন গণঅনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনশনরত কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে তার দায় ভিসিকেই নিতে হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে, অনশনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থা ভালো নেই, বেশির ভাগের অবস্থাই মরণাপন্ন। স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটায় কিছু শিক্ষার্থীকে অনশন ভাঙ্গার পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তার। এখন পর্যন্ত সিলেটের তিনটি হাসপাতালে মোট ১৬ জন গুরুতর অসুস্থ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে । এছাড়া, ভিসির বাসভবনের সামনে অনশনরত সাত জনের অবস্থাও ভালো নেই বলে জানান আন্দোলনকারীরা। জানা গেছে, ভিসির বাসভবনের সম্মুখে অনশনরত বেশিরভাগের অবস্থাই মরণাপন্ন। স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটায় কিছু শিক্ষার্থীকে অনশন ভাঙার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। এখন পর্যন্ত সিলেটের তিনটি হাসপাতালে মোট ১৬ জন গুরুতর অসুস্থ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়, ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থানরত সাতজনের অবস্থাও ভালো নেই বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত সিওমেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, শ্বাসকষ্টের কারণে দুইজন শিক্ষার্থীকে নেবুলাইজার দেয়া হচ্ছে, জ্বরের কারণে একজনকে এন্টিবায়োটিক দেয়া হচ্ছে। এছাড়া নরমাল ডায়েটের বাইরে তারা প্রায় চারদিন ধরে অনশন পালন করছেন। তাই, তাদের শারীরিক সমস্যা হচ্ছে এবং আইভি স্যালাইন দিয়ে তাদের পুষ্টি দেয়া হচ্ছে। এদিকে, ডায়াবেটিসের কারণে একজনকে নিয়ে ভয় ছিল। এখন সে মোটামুটি ভালো আছে।
এদিকে, দুপুর ১টায় সংবাদ সম্মেলন করেন অনশনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসা কাজল দাশ বক্তব্য রাখেন। ভিসির পদত্যাগ পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন বলে জানান। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শিশির চক্রবর্তী বরাত দিয়ে তারা জানায়, নিশাত নামে অনশনরত শিক্ষার্থীকে যদি মুখে কিছু না খাওয়ানো হয়; তাহলে তার খারাপ কিছু হতে পারে। ডাক্তাররা আরও জানিয়েছেন, তার সারারাত হাত-পা কাঁপছিল ও খিচুনি ছিল। শনিবার সকালে তার ইসিজি ও এক্স-রে করানো হয়েছে। এ সময় সংবাদ সম্মেলনে বাকি শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা তুলে ধরা হয়। কিন্তু কেউই অনশন ভাঙতে রাজি হচ্ছে না।
ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে অনশনের ২৩ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ১৬ শিক্ষার্থী গুরুতর অসুস্থ হলে তাদেরকে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া, বাকি ৭ জন ভিসির বাসভবনের সামনেই অনশন করছেন। এদিকে গণঅনশনের অংশ হিসেবে তিনজন নতুন করে অনশনে যোগদান করেছেন। নতুন করে ৩ জন যোগ দেওয়ায় মোট ২৬ জন অনশন পালন করছে। গত বুধবার বিকেল ৩টা থেকে ২৪ শিক্ষার্থী অনশন শুরু করলেও এক শিক্ষার্থীর বাবা হার্ট অ্যাটাক করায় অনশন ছেড়ে তিনি বাড়ি চলে যান।
এদিকে, শুক্রবার বিকেলে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনা করতে শিক্ষামন্ত্রী মোবাইলে কথা বলেন এবং ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীকে সিলেটে কিংবা অনলাইনে মিটিং করার কথা বলেন। এদিকে, শিক্ষকদের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল শিক্ষামন্ত্রীর সাথে ঢাকায় বৈঠক করেছেন।
রাতে গোলচত্বর এলাকায় মোমবাতি প্রজ্বলন করেন শিক্ষার্থীরা এবং ভিসি বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর গত রোববার সন্ধ্যায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার তথ্যচিত্র এবং অনশনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি প্রদর্শন করেন তারা।
এদিকে, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ভিসির কুশপুত্তলিকা নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে তার কুশপুত্তলিকা ক্যাম্পাসে দাহ করা হয়।
আন্দোলনে বাইরের কোনো ইন্ধন নেই বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ঘটনায় ঢাকায় শিক্ষামন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনের পর আন্দোলনকারীরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান।
শনিবার রাত ৯টায় ইয়াসির সরকার ও মোহাইমিনুল বাশার রাজ শিক্ষার্থীদের পক্ষে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা সাংবাদিকদের জানান, ‘মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে বলতে চাই এই আন্দোলন শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের উপর হামলার প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগের আন্দোলন। এখানে বাইরের কেউ ইন্ধন দিচ্ছে না। আমরা এখনই আলোচনা করতে রাজী। সেক্ষেত্রে ঢাকা থেকে প্রতিনিধি দল ক্যাম্পাসে এসে কিংবা ভার্চুয়ালি আলোচনা করতে হবে। এছাড়া শিক্ষকদের এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করার আহবান জানায় তারা।
