কালোটাকা সাদায় সাড়া নেই

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual7 Ad Code

অর্থনীতি ডেস্কঃ 

গত অর্থবছর (২০২০-২১) কালোটাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ‘বিশেষ’ সুবিধা অনেকে লুফে নেন। অপ্রদর্শিত জমি-ফ্ল্যাট এবং লুকানো নগদ অর্থ ও ব্যাংক আমানত রিটার্নে প্রদর্শনের হিড়িক পড়ে। এবার পুরোটাই উলটো চিত্র। চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) কালোটাকা বিনিয়োগের সাড়া নেই। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, জমি-ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ ও ব্যাংক আমানত রিটার্নে প্রদর্শন করেছে হাতেগোনা কয়েকজন।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শেয়ারবাজারসহ কয়েকটি খাতে করহার বাড়িয়ে নীতিমালা কিছুটা কঠোর করায় এবার কালোটাকা সাদা করার প্রবণতা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন মাত্র ছয়জন। যেখানে গত অর্থবছর ‘বিশেষ’ সুবিধা দেওয়ায় বিনিয়োগ করেছিলেন ২৮৬ জন। এবার কালোটাকা বিনিয়োগের বিপরীতে কর আদায় হয়েছে ৮১ লাখ টাকা, গতবার আদায় হয়েছিল ৪০ কোটি টাকার বেশি। এবারের ছয়জনের মধ্যে তিনজনই ময়মনসিংহ কর অঞ্চলের করদাতা। গতবার বিশেষ সুবিধা থাকার পরও ময়মনসিংহ থেকে একজনও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেননি।

অন্যদিকে লুকানো নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র রিটার্নে প্রদর্শনের আগ্রহে ভাটা পড়েছে। গত অর্থবছরে যেখানে ৭ হাজার ৫৫ জন করদাতা লুকানো নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র রিটার্নে প্রদর্শন করেছিলেন, চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৭০ জন তা করেছেন।

এক্ষেত্রে এনবিআর-এর কর আদায়ও কমেছে ব্যাপক হারে। এক হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল গত অর্থবছর। এবার সেটি সর্বসাকুল্যে ঠেকেছে সাড়ে ৬ কোটি টাকায়। অপ্রদর্শিত জমি-ফ্ল্যাট প্রদর্শনের অবস্থা আরও ভয়াবহ। অক্টোবর পর্যন্ত জমি প্রদর্শন করেছেন ৪৯ জন। আর ফ্ল্যাট প্রদর্শন করেছেন ১৮৪ জন। গতবার যেখানে জমি প্রদর্শন করেছিলেন এক হাজার ৬৪৫ জন এবং ফ্ল্যাট প্রদর্শন করেছিলেন ২ হাজার ৮৭৩ জন। সবচেয়ে বেশি জমি-ফ্ল্যাট প্রদর্শন করেছেন গাজীপুরের করদাতারা।

Manual3 Ad Code

কেন এই অবস্থা : গত অর্থবছর কালোটাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে এনবিআর ‘বিশেষ’ সুবিধা দিয়েছিল। যেখানে একজন করদাতাকে বিনা প্রশ্নে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিবিদ, পেশাজীবীদের চাপের মুখে এনবিআর আইনটি পরিবর্তন করে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২৫ শতাংশ করের পাশাপাশি ৫ শতাংশ জরিমানা আরোপ করা হয়। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে কালোটাকা বিনিয়োগ করতে চাইলে ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হবে। এত বিশাল কর ব্যবধান বিনিয়োগে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা।

Manual2 Ad Code

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান ইউনুসূর রহমান বলেন, এটাই তো হওয়ার কথা ছিল। কর বেশি থাকলে কেউ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না, বিষয়টি বাজেটের আগে আমরা এনবিআরকে বলেছিলাম। এখন তাই হয়েছে। গতবারের মতো সুযোগ দেওয়া হলে শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ বাড়বে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। নিয়মিত আয়করের অতিরিক্ত জরিমানা দিয়ে কেউ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে আসবে না। গতবার বিশেষ সুযোগ দেওয়ায় বিনিয়োগ বেড়েছিল। এবার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় কালোটাকার অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

Manual1 Ad Code

অন্যদিকে চলতি অর্থবছর লুকানো নগদ অর্থ, সব ধরনের ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র রিটার্নে প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও কর বাড়িয়েছে এনবিআর। যেমন গতবার লুকানো অর্থ রিটার্নে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর দিলেই চলত। এবার সেটি বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

Manual5 Ad Code

অবশ্য চলতি অর্থবছরে উৎপাদনশীল খাতে কালোটাকা বিনিয়োগের বিশেষ সুবিধা (১৯এএএএএএ) দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের যে কোনো জায়গায় ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকায় শিল্পকারখানা করা যাবে।

এ পদ্ধতিতে টাকা সাদা বা বিনিয়োগ করলে দুদক বা অন্য কোনো সংস্থা প্রশ্ন করবে না। যদিও ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকেই ১০ শতাংশ কর দিয়ে (১৯ডিডি) শিল্পে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে সেটি শুধু হাইটেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ সুবিধার ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত থাকবে।

কালোটাকার ইতিহাস : স্বাধীনতার পর থেকে নানাভাবেই কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। মূলত কালোটাকাকে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে এ সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৭১-৭৫ সাল পর্যন্ত ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা সাদা করা হয়। সে সময়ে সরকার এ থেকে মাত্র ১৯ লাখ টাকা আয়কর পায়। পরবর্তীকালে এ সুবিধা বহাল থাকায় প্রতিবছরই কালোটাকা সাদা করার পরিমাণ বাড়তে থাকে। ’৭৬-৮০ সাল পর্যন্ত ৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সাদা করা হয়, সরকার আয়কর পায় ৮১ লাখ টাকা।

’৮১-৯০ পর্যন্ত ৪৫ কোটি টাকা সাদা হয়, সরকার আয়কর পায় ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ’৯১-৯৬ পর্যন্ত ১৫০ কোটি টাকা সাদা হয়, আয়কর আদায় হয় ১৫ কোটি টাকা। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছিলেন। এরপর গত অর্থবছরেই সর্বোচ্চসংখ্যক করদাতা কালোটাকা সাদা করার সুবিধা নিয়েছিলেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code