কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতুর দাবী দীর্ঘদিনের: মৌলভী বাজারের রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জের লাখো মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

লেখক:
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual5 Ad Code

এম আহমদ আলী::

কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতুর জন্য মৌলভী বাজারের রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জের লাখো মানুষ দীর্ঘদিন থেকে দাবী জানিয়ে আসছেন। সেতু না থাকায় মৌলভী বাজারের রাজনগর ও সিলেটের বালাগঞ্জের লাখো মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন । জনস্বার্থে কুশিয়ারা নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবী। সেতু হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি ফেরি চালু হলে কিছুটা হলেও জনদুর্ভোগ লাঘব হবে।

Manual4 Ad Code

সিলেট বিভাগের দু’টি উপজেলা রাজনগর ও বালাগঞ্জ। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে এই দু’টি উপজেলার মানুষের। দুই উপজেলার লাখো মানুষের আত্মীয়তা সিলেটে যাতায়াতসহ যোগাযোগের জন্য দীর্ঘ দিন থেকে দাবী জানানোর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের দেয়া প্রতিশ্রæতিতে দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতুর। দুই উপজেলাসহ এই সড়কে চলাচলকারী লাখো মানুষের মাঝে এই প্রশ্ন। কবে পূূরণ হবে এই স্বপ্ন?

Manual7 Ad Code

রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু দু’টি উপজেলার লাখো মানুষের প্রাণের দাবী। একটি সেতুর অভাবে যুগের পর যুগ ধরে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরম অবহেলিত কুশিয়ারা তীরবর্তী রাজনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের প্রায় দশ লাখ মানুষ। অবহেলিত এ এলাকায় কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সূচিত হবে এক সম্ভাবনাময় যুগের। এই এলাকার মানুষের দাবী বিবেচনা করে ২০১৪ সালে মৌলভী বাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মহসিন আলী সেতুর ব্যবস্থা হবার আগ পর্যন্ত ফেরি চলাচলের প্রতিশ্রæতি দেন। তিনি প্রতিশ্রæতি দিলেও আজ পর্যন্ত ফেরি চালু বা সেতু বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ এখনো নেয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,তৎকালীন বৃটিশ আমলে জকিগঞ্জ থেকে ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুশিয়ারা নদী দিয়ে বড় বড় নৌযান চলাচল করতো। বাংলাদেশের নৌবন্দর ও নৌঘাট গুলোর অন্যতম ছিল কুশিয়ারা তীরবর্তী সিলেটের জকিগঞ্জ বাজার,কালীঘাট,শেওলা,বালাগঞ্জ বাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওর তীরবর্তী রাজনগর-বালাগঞ্জের মধ্যবর্তী বিলবাড়ি। এসব স্থানে পণ্যবাহী নৌযানে করে ব্যবসায়ীরা মালামাল পরিবহন করতেন। বৃহত্তর সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল এসব নৌবন্দরের খ্যাতি রয়েছে দেশে-বিদেশে। দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীদের পদচারণায় দিন রাত মুখরিত থাকতো এ অঞ্চল। সে সময় রাস্তা-ঘাট ততটা উন্নত ছিলনা তাই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদী পথে লঞ্চ, স্টিমার ও বড় বড় নৌকা। তৎকালীন বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা কুশিয়ারা নদী তীরের এসব বন্দর থেকে বিভিন্ন দ্রব্য সংগ্রহ করে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন। সে সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পণ্য সংগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রই ছিল কুশিয়ারা-কাউয়াদীঘি হাওর তীরবর্তী রাজনগর-বালাগঞ্জ মধ্যবর্তী বিলবাড়ি অঞ্চল। কালের বিবর্তনে এবং দেশের স্থলপথের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর চরম অবহেলিত এ অঞ্চলের হাজার হাজার পেশাজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নৌকা যুগে কুশিয়ারা পার হয়ে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করছেন।

রাজনগরের কুশিয়ারা তীরবর্তী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দূরবর্তী হওয়ায় স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন কুশিয়ারা নদী পার হয়ে বালাগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করছে। বিভিন্ন সময় নৌকাডুবির মত মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটছে। তাই, অবহেলিত এ অঞ্চলের লোকজনের দাবী কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতুর। সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু রাজনগর-বালাগঞ্জ নয়, পার্শ্ববর্তী ফেঞ্চুগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার মানুষও উপকৃত হবেন। সেই সাথে সিলেট-সুলতানপুর-বালাগঞ্জ সড়ক দিয়ে রাজনগর-মৌলভী বাজার হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হবে। সময়ও বাঁচবে।

একটি মাত্র সেতু নির্মাণের ফলে সিলেট-মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে সহজে যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনায় মৌলভী বাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদের প্রচেষ্টায় এই সেতুটি বাস্তবায়নের আশা করছেন দুই উপজেলার মানুষ।

রাজনগর উপজেলার ফতেহ পুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহ পুর গ্রামের বাসিন্দা দক্ষিণ সুরমার সিলাম শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. মুক্তাদির একাডেমীর অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ বুলবুল এ প্রতিবেদককে জানান,কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণ পারে তোলা পুর খেয়াঘাট থেকে নৌকা যোগে নদী পার হয়ে বালাগঞ্জ বাজারে আসতে হয়। কুশিয়ারা নদীতে সেতু না থাকায় যুগযুগ ধরে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। নদী পার হয়ে বালাগঞ্জ থেকে তাজপুর হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট যেতে হয়। তবে বালাগঞ্জ ডাক বাংলোর কাছে বড়ভাগা নদীর উপর সেতু হলে সিলেট-সুলতান পুর সড়ক দিয়ে কম সময়ে সিলেট যাতায়াত সম্ভব। তিনি বর্তমান সরকারের আমলে সারা দেশে সেতু এবং সড়ক নির্মাণ হলে ও এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী কুশিয়ারা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিক হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানাযায়,উভয় তীরের মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে বিগত ২০১৩ সালের প্রথম দিকে কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী বিলবাড়ি অঞ্চলে একটি ব্রীজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরিদর্শনে এসেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের প্রকৌশলী অধ্যাপক সুজিত কুমার বালা ও অধ্যাপক তারেকুল ইসলাম। তারা ব্রীজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য কুশিয়ারা তীরবর্তী বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করে তাদের পরিদর্শন রিপোর্টটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেন। পরিদর্শনের সময় তাদের সাথে ছিলেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী,মৌলভীবাজার-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীর প্রতিনিধি সৈয়দ মোস্তাক আলী,বালাগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুর, রাজনগর উপজেলার তৎকালীন প্রকৌশলী রুবাইয়াত জামান, বালাগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ উভয় এলাকার নেতৃবৃন্দ।

উল্লেখ্য তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী মন্ত্রী হবার পর বিগত ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রæয়ারী রাজনগরে তাকে দেয়া এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে এলাকার মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে তিনি ঘোষনা করেছিলেন তিন মাসের মধ্যে রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীর উপর ফেরির ব্যবস্থা করা হবে এবং তিন বছরের মধ্যে সেতু ব্যবস্থা করা হবে।

কিন্তু ঘোষণার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীতে ফেরি অথবা সেতুর ব্যবস্থা করা হয়নি। এছাড়াও বিগত ২০১৫ সালের ২৫ মে রাজনগরে এক অনুষ্ঠানে কুশিয়ারা সেতুর নির্মাণ কাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলে তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী পূণরায় ঘোষনা দিলেও তার অকাল মৃত্যুতে সেতুটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে এলাকাবাসী মনে করছেন। সৈয়দ মহসিন আলী বেঁচে থাকলে হয়তো রাজনগর-বালাগঞ্জবাসীর এই স্বপ্ন এতদিনে তিনি পূরণ করতেন। এই সময় সেতুটি নিমার্ণের ব্যাপারে রাজনগর উপজেলার সাবেক প্রকৌশলী রুবাইয়াত জামান জানিয়েছিলেন,রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা সেতুর জড়িপ কাজ শেষে ৪২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল এবং এই সময়ে তা একনেকের সভার এজেন্ডাভূক্ত ছিল। একনেকে প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন সাপেক্ষে যথাযত প্রক্রিয়া শেষে রাজনগর এলজিইডি বিভাগের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হবার কথা।

এ ব্যাপারে বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুর জানান, রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের কুশিয়ারা নদীর উপর সেতু নির্মাণের জন্য আমি নিজেও কাজ করেছি। কুশিয়ারা নদীর উপর শুধুমাত্র একটি সেতুর জন্য অবহেলিত এ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা,অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তনের ছোয়া লাগবে। তিনি বলেন, অবহেলিত এ জনপদের মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে যত সম্ভব কুশিয়ারা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।
রাজনগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শাজাহান খান বলেন,গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক এলাকায় দু’টি উপজেলা জেলা পাশাপাশি। কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু বদলে দিতে পারে উভয় এলাকার কৃষি,শিক্ষা,স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক অর্থনীতিকে। তাই যত দ্রæত সম্ভব এই সেতুটি বাস্তবায়ণ প্রয়োজন।

Manual6 Ad Code

এব্যাপারে মৌলভীবাজার-৩(সদর-রাজনগর) আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ বলেন,রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কে কুশিয়ারা নদীতে একটি সেতু নির্মাণ অতি প্রয়োজন। এর প্রক্রিয়াটি কোন পর্যায়ে রয়েছে তা জেনে দুটি উপজেলার লাখো মানুষের স্বপ্ন পূরণে আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

 

Manual2 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code