কেন খুলছে না বিশ্ববিদ্যালয়?

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual5 Ad Code
নিউজ ডেস্কঃ করোনা মহামারির কারণে দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর গেল ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে স্কুল-কলেজ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তবে শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া ছাড়া খুলতে নারাজ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে টিকার প্রথম ডোজ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত হলেও তা ধীরগতিতেই এগোচ্ছে। মূলত হল খুলে দিতেই সব শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনতে চান তাঁরা। কিন্তু জাতীয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক সুবিধা নেই বললেই চলে। এর পরও সেগুলো কেন খোলা হচ্ছে না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র জানায়, দেশের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। এর মধ্যে ৫১ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। আর ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় চার লাখ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দুই হাজার ২৫৮টি কলেজে শিক্ষার্থী প্রায় ২৮ লাখ। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় পাঁচ লাখ। আর আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রয়েছেন আরো প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী।

Manual7 Ad Code

ইউজিসি সূত্র জানায়, গত সপ্তাহ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার ৪১ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ শিক্ষার্থী করোনা টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ। আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন এক লাখের মতো শিক্ষার্থী, যাঁদের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে বলে শঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় যত দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যায় ততই শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে। অন্য দেশেও সেভাবেই শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। কিন্তু আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র তিন লাখ শিক্ষার্থীর জন্য পিছিয়ে পড়ছেন উচ্চশিক্ষার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ৩৮ লাখ শিক্ষার্থী।

Manual6 Ad Code

ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘একেক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা করার সুযোগ নেই। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে টিকার প্রথম ডোজ নিতে বলা হয়েছে। এরপর নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল ঠিক করবে কবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে। শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রেশন করলে টিকা নিতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তবে যাদের এনআইডি নেই তাদের জন্য বিকল্প পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ আমরা করেছি।’

সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটা ডেডলাইন ঠিক করে দিতে বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা ও প্রস্তুতি জানতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। ওই বৈঠকে শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতিকে রাখা হয়েছে। কিন্তু দেশে ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও তাদের উপাচার্যদের সঙ্গে একবারও বসেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রস্তুতি বা সমস্যার কথা জানাতে পারেননি উপাচার্যরা। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সিদ্ধান্তে বন্ধ রাখতে হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে আট লাখ ছাত্র-ছাত্রীর তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন। বাকি ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অনেকেরই এনআইডি নেই। তবে তাঁরা এখন জন্ম সনদ দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন।’ ড. মশিউর আরো বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখিনি। করোনা শুরুর কিছুদিন পর থেকেই আমরা অনলাইন ক্লাস শুরু করেছি। বড়সংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করছে। পরীক্ষাগুলো সরাসরি শুরু করে দিয়েছি। আমরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেব না, যাতে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ঝুঁকিতে পড়েন। আবশ্যকতা বুঝে পর্যায়ক্রমে আমরা সরাসরি ক্লাস চালু করব।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ব্যাপারে একবারও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বসেনি। আমাদের মতামতও কেউ জানেনি। শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠক করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটা গাইডলাইন ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। যদি ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আগে থেকেই কেন ভিন্ন চিন্তা করা হলো না?’

টাঙ্গাইলের একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক খোলা। কিন্তু ডিগ্রি শাখা এখনো খোলেনি। অথচ শিক্ষার্থীদের সবাই নিয়মিত বাইরে যাচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক। সব শিক্ষার্থীর টিকা দিয়ে খুলতে হলে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীরা কলেজে আসত তাহলেই বরং আমরা তাদের টিকার ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ নিতে পারতাম। একই সঙ্গে পড়ালেখাও চালু রাখতে পারতাম।’

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বয়স ১৮ বছর পার হলেও অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফলে অনেকেই টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করতে পারছিলেন না। এ জন্যই সম্প্রতি ইউজিসি একটি ওয়েবলিংক  (https://univac.ugc.gov.bd) চালু করেছে। এর মাধ্যমে যাঁদের এনআইডি নেই তাঁদের ২৭ সেপ্টেম্বরে মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, তাঁরাও এই লিংক ব্যবহার করে সুরক্ষা অ্যাপের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে টিকার নিবন্ধন করতে পারবেন।

আগে থেকেই অনেক শিক্ষার্থী টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করলেও তাঁদের এসএমএস না আসায় টিকা নিতে পারছেন না। ফলে এখন এনআইডি ছাড়া শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রেশন করলেও তাঁদেরও তাড়াতাড়ি টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে কোনোভাবেই ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্ধেক শিক্ষার্থীকেও টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া সম্ভব হবে না।

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সহসভাপতি ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সব সময় সরকার ও ইউজিসির নির্দেশনা মেনে চলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেহেতু ২৭ সেপ্টেম্বরের পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে বলেছে আমরা সে পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেও আমরা তাকিয়ে আছি। তারা কবে খোলে সেই অনুসারেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় খোলার তারিখ নির্ধারণ করবে।’

Manual7 Ad Code

জানা যায়, দীর্ঘ দেড় বছর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা। কারণ তাদের বেশির ভাগ কলেজই বেসরকারি। মফস্বলের বেসরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরাও দরিদ্র পরিবারের। তাদের অনেকেরই ডিভাইস নেই। মফস্বলে ইন্টারনেট ও বিদ্যুতেরও সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া মফস্বলের কলেজগুলোতে শিক্ষকরাও তথ্য-প্রযুক্তিতে তেমনভাবে দক্ষ নয়। এমনকি বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স যেসব শিক্ষকরা পড়ান তাঁরা এখনো এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষায় পাঠদান করানো শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না। এতে তাঁরা অনলাইন ক্লাসে খুব একটা আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে বেসরকারি কলেজে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এত দিনে পড়ালেখা থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। এই অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে আরো দেরি হলে সমস্যা আরো দীর্ঘায়িত হবে, সেশনজট আরো বাড়বে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code