

ডেস্ক রিপোর্ট :: কোচিং বাণিজ্য এবার নাম বদলে চলছে প্রাইভেট। পরীক্ষার সময় স্কুল শিক্ষকদের কোচিংয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ব্যাচ পড়ানোর আদলে দেদারসে চলছে কোচিং বাণিজ্য। ব্যাচ বা প্রাইভেট যে নামেই বলা হোক না কেন, আসলে তা মোড়ক পাল্টে পুরানো কোচিং চলছে জমজমাট। বন্দর নগরী খুলনার চিত্রও এমনটা। নগরীর ফুলমার্কেট এলাকার ‘থ্রি ডক্টরস’ দীর্ঘ দিন মেডিকেলে ভর্তির কোচিং চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এখন বিজ্ঞান লাইব্রেরি নামে সেখানেই চলছে কোচিং। ভিন্ন কৌশলে এ প্রতিষ্ঠানের মতোই নগরজুড়ে প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানে চলছে জমজমাট কোচিং বাণিজ্য।
কোচিং সেন্টারের আদলে ব্যাচ নাম দিয়ে অনেক স্কুল শিক্ষক ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগেরই পরিচালক কোনো না কোনে নামিদামি স্কুল-কলেজের শিক্ষক। এর মধ্যে রয়েছেন- খুলনা মডেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের হাবিবুর রহমান সবুর, এম এ মজিদ ডিগ্রী কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের অসিত বরণ মণ্ডল, কে পি সি বয়রা কলেজের গণিত বিভাগের রোকোনুজ্জামান মিলন, প্রেসক্লাবের পেছনে শিখা ম্যাডাম, কেএমজিসি এর গণিতের শিক্ষক বিধান, সিটি কলেজের সামনে গণিত বিভাগের বিচক্ষণ, শামসুর রহমান রোডের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক শচীন, মৌলভীপাড়ার পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বাহার, মডার্ন ফার্নিচারের ৩য় তলার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাইদ, জীব বিজ্ঞানের হাশেম, বিকাশ, পিটিআই মোড় ডান পাশের বিল্ডিংয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পলাশ, মডার্ন ফার্নিচারের ২য় তলার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নরোত্তম, মডার্ন ফার্নিচারের স্ট্যাডি কোচিংয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নারায়ন, মডার্ন ফার্নিচারের মোড়ের রসায়নের রাজু, মডার্ন স্টাডি কোচিং রসায়নের দেব প্রকাশ।
আরো যারা প্রাইভেট বা ব্যাচের নামে কোচিং চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন পিটিআই মোড় থেকে মিয়াপাড়ার দিকে গণিতের শিক্ষক মনির স্যার, পিটিআই মোড়ে গণিত বিভাগের নারায়ন, মৌলভীপাড়ার নাসির গার্ডেনে গণিতের মনির, মডার্ন ফার্নিচার মোড়ের জীববিজ্ঞানের মোদাচ্ছের ও অদিত্য, ইংরিজি বিভাগের গোস্বামী, গণিত বিভাগের অসিত, সোনাডাঙ্গার সার্জিক্যালের বিপরীত গলিতে রসায়নের নবগোপাল, শামসুর রহমান রোডের শচিনের বিল্ডিংয়ের ৩য় তলায় জীববিজ্ঞানের দিলীপ, দৌলতপুরে পদার্থবিজ্ঞানের ইলিয়াস ও জীববিজ্ঞানের সব্যসাচী, মিয়াপাড়ার জীববিজ্ঞানের নীলিমা ও গণিতের রায়হান, মডার্ন টাওয়ার সিটি কলেজের জীববিজ্ঞানের ম্যাডাম নিগার সুলতানা, খুলনা বিএল কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের জামাল উদ্দিন, ফুলতলা মহিলা কলেজের জীববিজ্ঞানের ইসমত আরা, পদার্থবিজ্ঞানের কাবেরী সাহা, রসায়নের পরিমল ও গণিতের মান্নান।
এসব শিক্ষকরা ব্যাচের নামে দিব্যি চালিযে যাচ্ছেন কোচিং বাণিজ্য। একইভাবে শিক্ষাসাগর, কে জামান, ইন্টার এইড, আইডিয়াল, ইউসিসি, সাইফুরস, লজিক অ্যাকাডেমিসহ অনেকেই অব্যাহত রেখেছেন রমরমা কোচিং বাণিজ্য। কারো কারো রয়েছে একাধিক শাখাও।
মন্ত্রণালয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ জারি করলেও তা মানচ্ছেন কেউই। নীতিমালা জারির প্রথম দিকে সংশ্লিষ্টদের নজরদারির কারণে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল এসব কোচিং-প্রাইভেট। কিন্তু কিছুদিন পরই ফের আগের মতোই কোচিং বাণিজ্য শুরু করেন শিক্ষকরা। বর্তমানে এ নীতিমালা কাগজেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ সুধীজনের।
খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, এইচএসসিতে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে গত বছর পরীক্ষার সময় এক মাস কোচিং বন্ধ থাকলেও এবার খুলনায় পরীক্ষার সময়েও চলছে প্রাইভেট-ব্যাচ নামের কোচিং। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু শিক্ষক কৌশলে চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষাবাণিজ্য।
এছাড়া শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফলের আশায় স্কুল বাদ দিয়ে কোচিংয়ের দিকেই ঝুঁকছে বেশি। এর ফলে অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি।
এদিকে, খুলনায় স্কুল সময়ে কোচিং সেন্টার চালুর পক্ষে রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান নেয়ায় এসব শিক্ষাবাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
২০১৭ সালে কোচিংয়ের বিরুদ্ধে খুলনার স্থানীয় প্রশাসন সাড়াশি অভিযান শুরু করলে অধিকাংশ কোচিং বন্ধ হয়ে যায়। পরে খুলনা কোচিং পরিচালক অ্যাসোশিয়েশনের ব্যানারে কোচিং চালু রাখতে একটি মানববন্ধন করা হয়। ওই মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলসহ অনেকে। এর পরই ঝিমিয়ে পড়ে প্রশাসনের সেই সাড়াশি অভিযান।
খুলনা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের উপ-পরিচালক নিভা রাণী পাঠক বলেন, শিক্ষকদের কোচিং বন্ধে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন। চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারও তিনটি প্রতিষ্ঠান ভিজিট করা হয়েছে। চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পরীক্ষার সময়ে কোচিং বন্ধের নির্দেশনা অমান্য করে যারা কোচিং চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।