

ইকবাল আহমদ চৌধুরী:: এখন থেকে প্রায় তিন মাস আগে; মার্চের শেষ সপ্তাহে অক্সফোর্ডের প্রফেসর মিসেস ইমা স্মিথ তাঁর একটি লেখা আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। লেখাটি নিউইর্য়ক টাইমসে প্রকাশিত হয়। রচনার মূল শিরোনাম ছিল- What Shakespeare Teaches Us With Pandemics.
(বৈশ্বিক মহামারীকালীন সময়ে শেক্সপিয়ার আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছেন)।
•
মার্চের ২২ তারিখ থেকে ইংল্যান্ডে ফুল লকডাউন জারি হয়। নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এ সময় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। চারদিকে ভয়, আতংক আর অনিশ্চয়তার এক গভীর অমানিশায় আমরা আপতিত হই।
ইতালি, ফ্রান্স এবং স্পেন- ইউরোপিয়ান এই তিন দেশে করোনা তখন সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে আঘাত করে চলেছে। প্রতিদিন গড়ে ৮০০/৯০০ মানুষের মৃত্যু দেখতে দেখতে ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। টেলিভিশনের পর্দায় আমরা তাঁর কান্না জড়িত কণ্ঠে ঈশ্বরের সাহায্য চাইতে দেখেছি!
•
মিসেস স্মিথ তাঁর লেখা শুরু করেছিলেন ট্রেন্ডিংয়ে উপরের দিকে থাকা একটি টুইট বার্তা দিয়ে। বার্তাটি ছিল এ রকম- “শেক্সপিয়ার যখন কিং লিয়ার নাটক রচনা করেন, তখন তিনি প্ল্যাগ মহামারীর কারণে কোয়ারেন্টাইনে!”
(When he was in quarantine from the plague, William Shakespeare wrote “King Lear.”)
শিরোনাম এবং শুরুর লাইন দেখে আমি বুঝে নিয়েছিলাম এটি সমসাময়িক মহামারী কোভিড ১৯ নিয়ে ভালো লেখা হবে। আমরা লকডাউনে ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছি। এই বন্দি হওয়াকে ইংরেজিতে কোয়ারেন্টাইন লাইফ বলে। আবার অনেকে করোনা ভাইরাসের সিম্পটম নিয়ে আইসোলেশনে চলে গেছেন। ইংরেজি আইসোলেশন শব্দের বাংলা হচ্ছে একাকী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
•
কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনের এই লাইফে আমরা যাতে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে না পড়ি তার জন্য প্রফেসর স্মিথ শেক্সপিয়ারের এই গল্প সামনে নিয়ে এসেছেন। ইংরেজি সাহিত্যের সবচে উঁচু মানের লেখক, কবি ও নাট্যকার ছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার। তাঁর জীবনের ভালো রচনা গুলি তিনি যখন লিখেন তখন ইংল্যান্ডব্যাপী প্ল্যাগ মহামারী রূপে থাকত! ঘরে কোয়ারেন্টাইন থেকে থেকে কিং লিয়ার সহ অনেক বিখ্যাত ট্রাজেডি নাটক তিনি রচনা করেছিলেন।
•
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ১৫৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।ইংল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলীয় ওয়ারউইকশায়ার কাউন্টিতে। ‘স্ট্রাটফোর্ড আপঅন অ্যাভন’ নামে এক ছোট্ট ভিলেজে। অক্সফোর্ডশায়ারে আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে মাত্র ৬০ মাইল উত্তরে। ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে এক ঘন্টার ড্রাইভিং দুরত্ব। লন্ডনের উপকণ্ঠে স্ট্রাটফোর্ড নামে একটি আধুনিক সিটি এরিয়া আছে। অনেকে এই অঞ্চলকে শেক্সপিয়ারের বাড়ি মনে করলে ভুল করবেন। লন্ডন থেকে শেক্সপিয়ারের ছোট্ট শহরের দূরত্ব প্রায় ১০২ মাইল।
ষোল শতকে শেক্সপিয়ার যখন লেখালেখিতে আসেন ইংরেজি সাহিত্যে রেনেসাঁর যুগ অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। তখন টেলিভিশন আবিষ্কার হয়নি, থিয়েটার এবং মঞ্চ নাটক ইউরোপিয়ন সমাজে বিনোদনের সবচে বড় মাধ্যম। এক সময় চাকরির সন্ধানে শেক্সপিয়ার গ্রাম ছেড়ে রাজধানী শহর লন্ডনে চলে আসেন। থিয়েটারে কাজের বয় হিসেবে চাকরি নেন। তবে, প্রায়ই অনেক কলা কুশলীর অনুপস্থিতে স্ক্রিপ্ট বলা, অভিনয় করা-এসব প্রক্সি দেয়ার সুযোগ পেয়ে যেতেন।
এক পর্যায়ে এসব অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর নিজের মেধা আর সৃজনী শক্তির দুয়ার আপনা আপনি খুলে যায়। তিনি নাটক, কবিতা ইত্যাদি লিখতে শুরু করেন; এমনকি মঞ্চে অভিনয় করারও অনুরোধ আসতে থাকে।শেক্সপিয়ার হয়ে উঠেন পৃথিবীর বিখ্যাত প্রতিভাবান লেখক। ট্রাজেডি, কমেডি সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯টি নাটক রচনা করেন। সনেট কবিতা রচনা করেন প্রায় ১৫৪ টি।
•
পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় শেক্সপিয়ারের রচনা অনুবাদ হয়েছে। তাকে অনেকটা ইংল্যান্ডের জাতীয় কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাহিত্যে তাঁর সময় কালকে এলিজাবেথান এবং জেকবিয়ান পিরিয়ড হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। শেক্সপিয়ার নিজের আটারো বছর বয়সে ছাব্বিশ বছর বয়সী এক মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁরা দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সন্তানের জনক হয়েছিলেন। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তাঁদের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
এগার বছর বয়সে শেক্সপিয়ারের ছেলে অজানা এক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বড় মেয়ে সুজানা ১৬০৭ সালে এক ডাক্তার ছেলেকে বিয়ে করেন। নাম জন হল। ছোট মেয়ে জুডিথ ১৬১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে থমাস কুইনি নামে এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন। থমাস কুইনি বিয়ের আগে মার্গারেট হুইলার নামে এক মহিলার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক রাখতেন। সেই মহিলা এক পর্যায়ে কনসিভ হয়ে পড়েন এবং বাচ্চা প্রসব করার সময় দুঃখজনক ভাবে মারা যান।
কোর্ট এবং চার্চে শেক্সপিয়ারের মেয়ে জামাই ‘থমাস কুইনি’ অবৈধ পিতা হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হন। এই ঘটনায় শেক্সপিয়ার খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। পরিবার এবং বংশের ইমেজ রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। চার্চের সাথে অর্থ জরিমানার বিনিময়ে একটা সমঝোতায় পৌঁছান। এই কোর্ট ইন্সিডেন্টের ঠিক এক মাস পর ২৩ এপ্রিল ১৬১৬ সালে শেক্সপিয়ার মারা যান।
••
শেক্সপিয়ারের ৫১ বছর জীবনের গোটা সময়কালে বেশ কয়েকবার প্ল্যাগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। তিনি যে বছর জন্ম গ্রহণ করেন সে বছর তাঁর শহরে চার ভাগের এক ভাগ মানুষ প্ল্যাগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন। ১৫৬৪, ১৫৮১, ১৫৯২, ১৬০৩, ১৬০৪, ১৬০৬- এই বছর গুলিতে বৃটেনে প্ল্যাগ মহামারী রূপ ধারণ করেছিল। করোনা ভাইরাসের মত প্ল্যাগ একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ হিসেবে বিবেচিত হত। কার্যকর কোনো ঔষুধও তখন আবিষ্কৃত হয়নি।
•
প্রফেসর ইমা স্মিথ শেক্সপিয়ারের লেখাকে ন্যারেটিভ ভ্যাকসিন বা বর্ণনামূলক ওষুধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
“His work is a cultural prophylactic against understanding disease solely in quantitative terms, a narrative vaccine.”
মিসেস স্মিথ হলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের প্রফেসর। শেক্সপিয়ার স্টাডিজ ফ্যাকাল্টির শিক্ষক। শেক্সপিয়ারের সাহিত্য কর্মের উপর তিনি বিশেষ গবেষণা করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে শেক্সপিয়ারের উপর তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে This is Shakespeare.
আমাদেরকে তাঁর এই লেখা পড়তে দেয়ার মানে হল, লকডাউন লাইফে আমরা যাতে শেক্সপিয়রের মত লেখালেখিতে নিমগ্ন হয়ে করোনা ভাইরাসের ভয় এবং একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে পারি!
••
ঠিক একই সপ্তাহে এন্ড্রু ডিকসন নামে একজন তরুণ শক্তিমান ইংলিশ লেখক শেক্সপিয়ারের উপর বৃটিশ ডেইলি দ্য গার্ডিয়ানে একটি কলাম লেখেন। ৪১ বছর বয়সী ডিকসন একাধারে একজন লেখক, গবেষক এবং সাংবাদিক। ফ্রিলেন্সার হিসেবে তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন। গার্ডিয়ান, বিবিসি, নিউইউর্ক টাইমস নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশ করে। ক্যামব্রিজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে গ্রাজুয়েশন করেছেন। শেক্সপিয়ার এর সাহিত্য কর্মের উপর একটি বই লিখেছেন। নাম World’s Elsewhere: Journeys Around Shakespeare’s Globe. বইটি ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়।
এন্ড্রু ডিকসন গার্ডিয়ানে যে কলাম লেখেন তার শিরোনাম ছিল- Shakespeare in lockdown: did he write King Lear in plague quarantine?
প্রফেসর ইমা স্মিথের মত তিনিও শেক্সপিয়ার কোয়ারেন্টাইন লাইফে থেকে কিভাবে লেখালেখি করতেন তার বিস্তারিত বলেছেন।
১৫৯২ সালে লন্ডনে প্ল্যাগ আউটব্রেক করেছিল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি নাটকের থিয়েটার পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস তখন বন্ধ ছিল। এ সময় ইঁদুর থেকে প্ল্যাগ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়াচ্ছে বলে একটা মিথ চালু হয়। ১৬০৩ থেকে ১৬১৩ সাল এই দশ বছর শেক্সপিয়ারের লেখালেখির পিক পিরিয়ড ছিল।
ডিকসন হিসাব করে দেখেছেন এই দশ বছরে ১২০ মাস সময়ের মধ্যে ৭৮ মাস প্ল্যাগ মহামারীর কারণে জনজীবন লকডাউনে ছিল। লন্ডনে প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিল। শেক্সপিয়ার ভাগ্যক্রমের বেঁচে যান এবং কবিতা আর নাটক লিখে লিখে এই সময় অতিবাহিত করেন। ১৬১৩ সালে তিনি লন্ডন ছেড়ে নিজ শহর স্ট্রাটফোর্ড আপঅন অ্যাভনে চলে যান।
ষোল এবং সতের শতকে বৃটিশ সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের বেশ প্রভাব ছিল। শেক্সপিয়ারের জীবনের এই পঞ্চাশ বছরে কম করে হলেও প্রায় দশ বার প্ল্যাগ মহামারী রূপে আঘাত হেনেছে। চার্চের ধর্ম প্রচারকরা এটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন- “The cause of plagues is sin, and the cause of sin is plays.” অর্থাৎ, থিয়েটার নাটকের মাধ্যমে পাপ কাজ করা হয়েছে, পাপ কাজের কারণে প্ল্যাগ রোগ দেখা দিয়েছে!”
••
মার্চের শেষ দিকে আমি এন্ড্রু ডিকসনের এই লাইন গুলো পড়ার পর করোনা ভাইরাসকালীন ভয়, ভীতি আর মনোবল বাড়ানোর জন্য লিটারেচার, গবেষণা-কর্ম আর লেখালেখির সমস্ত চিন্তা বাদ দিয়ে দেই। তার বদলে ধর্ম-কর্ম, মানব কল্যাণ আর মৃত্যুকে বরং আলিঙ্গনের প্রস্তুতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের মনোবল চাঙা রাখার মূলমন্ত্র গ্রহণ করি!
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভাইরাস আক্রান্ত হওয়া আর শ শ মানুষের মৃত্যু- গোটা ইংল্যান্ডের বাতাস তখন পোড়া গন্ধময় হয়ে উঠেছিল। কয়েক সপ্তাহ জানালা খুলে বাইরে থাকানোর সাহস পর্যন্ত আমাদের হয়নি।
শেক্সপিয়ারের সময় ইঁদুর থেকে প্ল্যাগ ছড়িয়েছে! তাঁদের সমাজে ব্যভিচার, পরকীয়া, নারী পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক ছিল; বিনোদনের নামে থিয়েটারে তাঁরা বেহায়াপনার চর্চা করেছে! পাপের ফলস্বরূপ প্ল্যাগ মহামারী রূপে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বারবার ফিরে এসে জনপদে আঘাত হেনেছে।
আমাদের সময় বাদুড় থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে। পাপাচার, হানাহানি এবং পংকিলতার হিসাবে সতের শতকের শেক্সপিয়ারের সমাজ আর একবিংশ শতকের আমাদের সমাজ কী তুলনা করা চলে? কে এগিয়ে?
লেখকঃইকবাল আহমেদ চৌধুরী, একাডেমিক রিসার্চ
অক্সফোর্ড, ইংল্যান্ড