

ফিচার: চলতি ডিসেম্বরের ৭ থেকে ৯ তারিখ রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) বার্ষিক সম্মেলনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে ২৮ লাখ মানুষ।
২০২২ সালের হিসাবে দারিদ্র্য বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে এই করোনা মহামারি। একই বছর বৈশ্বিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি অনেক পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় সরাসরি বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বৈশ্বিক মন্দা দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। শুধু বৈশ্বিক মন্দার কারণে বাড়তি ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। এছাড়া জাতীয় নির্বাচন ঘিরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করছেন অনেকে। এমন নিষেধাজ্ঞা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সর্বাবস্থায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যেতে পারে, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
খাদ্য নিরাপত্তার সংজ্ঞা অনুযায়ী তখনই খাদ্য নিরাপত্তা বিরাজমান, যখন সবার একটি কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যনীতি ২০০৬-এ বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম একটি উপাদান হলো জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যের লভ্যতা (availability of food)। অপর অপরিহার্য উপাদান হলো ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা (access to food)। তৃতীয় উপাদন হচ্ছে খাদ্যের জৈবিক ব্যবহার (utilization of food)।
দেশে খাদ্য লভ্যতার মূল উৎস হলো কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে কৃষি খাত গঠিত) উৎপাদিত খাদ্যপণ্য। বিআইডিএস-এর উপর্যুক্ত সম্মেলনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ গঠিত জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসাবে ঘোষণা করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সাইক্লোন-ঝড়ের পৌনঃপুনিকতা বৃদ্ধি অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মতো বাংলাদেশের কৃষি খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। হ্রাস পাচ্ছে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতের ৬.৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে পরবর্তী এক দশকে গড়ে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়ায় (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০১৯-২০)। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩-এ বলা হয়েছে, ‘২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.১৭ শতাংশ, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩.০৫ শতাংশে। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ২.৬১ শতাংশে।’ কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শস্য উপখাতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফসল এবং আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য ধান তথা চাল এবং দ্বিতীয় খাদ্যশস্য গমের ওপর। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক ২০১৯-২০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত চাল উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি হার ছিল ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে (২০২৩-২৪) দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হার সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো ১ শতাংশ বা এর আশপাশে থাকবে বলেই ধারণা করা যায়। এদিকে ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১.৩৭ ও ১.৩ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২২ ও ২০২৩)। এর অর্থ দাঁড়ায়, চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। এতে চাহিদার তুলনায় চালের ঘাটতি একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের দ্বিতীয় খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের ১৯ লাখ টনের তুলনায় সাম্প্রতিককালে ১১ লাখ থেকে ১২ লাখ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দেশে গমের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার জন্য যেসব বিষয়কে দায়ী করা হয় সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে-ক. গম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ ও তীব্র শীত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যা কমে যাচ্ছে; খ. ব্লাস্ট ও অন্যান্য রোগে গমের ফলন হ্রাস; গ. গমের তুলনায় ভুট্টা, আলু এবং অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় চাষিরা এসব ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে হ্রাস পাচ্ছে গম চাষের জমি।
শুধু খাদ্যশস্য (চাল, গম) নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে অন্যান্য খাদ্যপণ্য যেমন: ডাল, ভোজ্যতেল, দুধ, চিনি, ফল, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ, আদা ইত্যাদি। চাহিদার তুলনায় এগুলোর উৎপাদন অনেক কম। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, বছরে ২৫-২৬ লাখ টন ডালের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ৮-৯ লাখ টন। বছরে চিনির ১৪-১৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম-বেশি ১ লাখ টন। পেঁয়াজের বার্ষিক ২২ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন কম-বেশি ১৯ লাখ টন। বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টন আদার চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনের পরিমাণ কম-বেশি ২ থেকে আড়াই লাখ টন।
খাদ্য লভ্যতার অন্য উৎসটি হলো আমদানি। চাহিদার তুলনায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হওয়ায় বাংলাদেশকে খাদ্যশস্যসহ (ধান, গম) বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে বণিক বার্তার ৫ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১, ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে যথাক্রমে ১৩ লাখ ৫৯ হাজার, ৯ লাখ ৮৭ হাজার এবং ১০ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল আমদানি করতে হয়। গত মৌসুমে বোরোর আশানুরূপ উৎপাদন এবং চলতি আমন মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাল আমদানি না করার সরকারি সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো চাল আমদানি করা হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আশা করছে, এবার আমন উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টনে, যা লক্ষ্যমাত্রার (১ কোটি ৭২ লাখ টন) চেয়ে ৩ লাখ টন বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিতব্য হিসাবে জানা যাবে এ বছর আমন উৎপাদনের প্রকৃত পরিমাণ। তবে অতীতের উদাহরণ থেকে অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবের সঙ্গে বিবিএস-এর হিসাবের তারতম্য ঘটবে; অর্থাৎ বিবিএসের হিসাবে আমনের উৎপাদন হ্রাস পাবে।
দেশে গমের চাহিদার (কম-বেশি ৭০ লাখ টন) প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। এদিকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দামের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়, তা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। আর মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কম-বেশি ২৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় দেশে গমের দামে উল্লম্ফন ঘটেছে। ২০২১ সালের প্রথমদিকে বাজারে এক কেজি আটার দাম ছিল ৩০-৩২ টাকা, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকার উপরে।