খামেনি ক্ষমতাচ্যুত হলে ইরানে কী হবে

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual2 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে ইসরায়েল। এমন ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক হামলার বিশ্লেষণ থেকে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যে ধর্মীয় নেতৃত্ব দেশটি শাসন করে আসছে, তা সরিয়ে দিলে নতুন যে নেতৃত্ব আসবে, তারা যে কম কট্টর হবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ইসরায়েল এখন আর শুধু ইরানের পারমাণবিক কিংবা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় আঘাত করছে না; বরং দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবিতেও হামলা চালিয়েছে। এতে অনেকের ধারণা, ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা নয়; বরং দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা খামেনিকেও সরিয়ে দেওয়া।

Manual1 Ad Code

কিন্তু তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা এই নেতাকে যদি সত্যিই সরিয়ে দেওয়া হয়, এরপর কী হবে?

২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পরের পরিস্থিতি এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটো অভিযানের পর ছড়িয়ে পড়া বিশৃঙ্খলার কথা ভেবে আজও আতঙ্কিত হন ইউরোপীয় নেতারা। উভয় দেশ থেকে একনায়ক সরানো গেলেও দেশ দুটি বছরের পর বছর ধরে রক্তাক্ত সহিংসতায় জর্জরিত ছিল।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সম্প্রতি কানাডায় অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আজকের দিনে সেনা অভিযানের মাধ্যমে ইরানের শাসন পরিবর্তন করতে চাওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। কারণ, এতে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আপনাদের কি মনে হয়, ২০০৩ সালে ইরাকের অভিযান কিংবা ২০১১ সালে লিবিয়ায় যা ঘটেছিল, তা সফল কিছু ছিল? মোটেই নয়!’

Manual7 Ad Code

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যদি খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের অপসারণ করা হয়, তবে যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তা হয়তো ভরাট হবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) বা সেনাবাহিনীর কট্টর অংশের দ্বারা।

থিংকট্যাংক কার্নেগি এনডাওমেন্টের গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, ‘ইসরায়েলের হামলা শুধুই পারমাণবিক কর্মসূচির নিষিদ্ধকরণ নয়, বরং তারা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে এবং তা স্পষ্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান; যেমন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনেও আঘাত হেনেছে। যদি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে এক উদার ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের আশা করা যেতে পারে। তবে বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসির মতো সংগঠিত শক্তির উত্থানও হতে পারে।’

ইরানের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রেজা পাহলভি। তিনি ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্র। রেজা পাহলভি বলেছেন, ‘ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র পতনের দ্বারপ্রান্তে।’ তিনি খামেনিকে ‘ইঁদুরের মতো গর্তে লুকিয়ে থাকা ভিতু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে তাঁর পিতার সময়কার উষ্ণ সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার পক্ষে এবং এই নতুন সম্পর্ককে ‘সাইরাস চুক্তি’ নামে অভিহিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে রেজা পাহলভি ইরান ও প্রবাসীদের মাঝে সর্বজনগ্রাহ্য নন। তাঁর ইসরায়েলপ্রীতি ও জাতীয়তাবাদ বিরোধীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি বিমান হামলার নিন্দা না করায়।

আরেকটি সংগঠিত বিরোধী দল হচ্ছে পিপলস মুজাহিদিন অব ইরান (এমইকে)। এই সংগঠনের নেত্রী মরিয়ম রাজাভি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বলেন, ‘ইরানের জনগণ এই সরকারের পতন চায়।’ তবে এমইকের অতীতে ইরাক-ইরান যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পাশে থাকার কারণে অনেক ইরানির মধ্যেই এদের প্রতি ঘৃণা রয়েছে।

Manual8 Ad Code

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস জুনো বলেন, ‘ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে সংগঠিত, গণতান্ত্রিক শক্তির অভাব রয়েছে। রেজা পাহলভি সবচেয়ে বেশি পরিচিত নাম হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সমর্থকেরা তাঁর জনপ্রিয়তা অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দেখান।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর বিকল্প হতে পারে বিপ্লবী গার্ডের সেনা অভ্যুত্থান কিংবা ধর্মতন্ত্রের জায়গায় সামরিক একনায়কতন্ত্রের সূচনা।’

Manual6 Ad Code

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জটিল জাতিগত গঠনের দিকটিও ভবিষ্যতের অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দেশটিতে পার্সিদের পাশাপাশি রয়েছে বড় সংখ্যায় কুর্দি, আরব, বালুচ ও তুর্কি সংখ্যালঘু। গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, ‘বিদেশি শত্রুরা ইরানের এই জাতিগত বিভাজনকে কাজে লাগাতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক সুফান সেন্টার জানিয়েছে, ইরানি শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এখন অনেক দেশের দৃষ্টিতে এক ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’। তারা সতর্ক করে বলেছেন, পোস্ট-রেজিম চেঞ্জ পরিস্থিতির কারণ ইরান ‘ইরাক ২.০’ হয়ে উঠতে পারে, যার প্রভাব শুধু এই অঞ্চলেই নয়, গোটা বিশ্বেই পড়বে।

ইরানে খামেনি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র পতনের সম্ভাবনা ঘিরে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনির পতন হলে ইরানে কী ধরনের নেতৃত্ব আসবে? দেশটি কি আরও কট্টর সামরিক শাসনে ঢুকে পড়বে, নাকি ভেঙে পড়বে গোষ্ঠীগত সহিংসতায়? এই প্রশ্নগুলোর কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ‘শাসন পরিবর্তন’ যতটা আকর্ষণীয় ধারণা মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ডেস্ক: আর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code