গাজায় বেসামরিকদের হত্যার নিন্দা করায় হামাস সমর্থক হয়ে গেছি: ইসরায়েলি শিক্ষক

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ২ years ago

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

Manual2 Ad Code

ইসরায়েলের ইতিহাস এবং পৌরনীতির শিক্ষক মিয়ার বারুচিন গাজায় চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পোস্ট দিয়েছিলেন। নিরীহ বেসামরিক গাজাবাসীর নির্বিচার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সমালোচনা করাই কাল হয়েছিল তার। শুরুতে চাকরি হারানো, তারপর রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে জেলে যেতে হয় তাকে। রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার বারুচিন সম্প্রতি অবজারভারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইসরায়েলে এখন বিরোধী মতকে দমন করার হচ্ছে। বেসামরিক নিরাপরাধদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিরোধিতা করায় আমি হামাস সমর্থক হয়ে গেছি।’

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে অতর্কিত হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সেদিনই গাজায় বোমা হামলা শুরু করে ইসরায়েল। তার পরদিন সামাজিক প্ল্যাটফর্মে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলার প্রতিবাদ করেন বারুচিন। গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরুর প্রথমদিকেই নিহত এক পরিবারের ছবি পোস্ট করে বারুচিন লেখেন, ‘নৃশংস সব ছবি আসছে। পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে—এমন সব খবর। আমি সাধারণত ফেসবুকে এ ধরনের ছবি আপলোড করি না। কিন্তু দেখুন, প্রতিশোধের নামে আমরা কী করছি! যদি কেউ মনে করেন যে, গতকাল যা ঘটেছে তার কারণে এটা ন্যায়সংগত তবে তাদের নিজেদের আনফ্রেন্ড করা উচিত। উন্মাদের মতো এসব কাজ বন্ধ করার জন্য আমি সকলকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে বলছি। এখনই এটা বন্ধ করো। পরে নয়, এখনই!!!’

এই পোস্টের দশদিনের মাথায়ই শিক্ষকতার চাকরি হারান বারুচিন। এক মাসের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেন উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গত নভেম্বরের শুরুতে জেরুজালেমের কুখ্যাত রাশিয়ান কম্পাউন্ড কারাগারে শুরু হয় ইতিহাস এবং পৌরনীতির শিক্ষক মিয়ার বারুচিনের নির্জন হাজতবাস। কারাগারে আটক রেখে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগের তদন্ত করা হয়।

বারুচিন জানতেন, তার মতামত কিছুটা বিতর্কিত বটে। তিন বছর আগেও অনেকটা একই ধরনের সমালোচনা করে তেলআবিবে শিক্ষকতার চাকরি হারিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। এবার তাকে জেলেও যেতে হয়েছে। কিন্তু মতামত প্রকাশ করাকে অত্যন্ত জরুরি বলেই ভেবেছেন এই শিক্ষক। মিয়ার বারুচিন বলেন, ‘অধিকাংশ ইসরায়েলিই ফিলিস্তিন সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তারা ভাবে, ফিলিস্তিনের সবাই সন্ত্রাসী। তাদের কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই, পরিবার নেই, ঘর নেই, আশা নেই। আমি কেবল আমার পোস্টে এটাই বলতে চেয়েছিলাম যে, ফিলিস্তিনিরাও মানুষ।’

Manual8 Ad Code

ইসরায়েলের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং অধিকার কর্মীরা বলেছেন, গাজার যুদ্ধ সম্পর্কে ভিন্নমতকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না ইসরায়েলে। এমনকি তিন মাস ধরে হামলা চালিয়ে যে ২৩ হাজারের বেশি বেসামরিকদের হত্যা করা হলো, তারও প্রতিবাদ করা যাবে না। আর প্রতিবাদ করলে তার পরিণতিই হবে বারুচিনের মতো। এই শিক্ষকের মতে, সবাইকে একটি বার্তা দেওয়ার জন্যই তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে ইসরায়েল সরকার। আর সেই বার্তাটি হলো, ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা বা প্রতিবাদের ইঙ্গিতও করা যাবে না।

Manual2 Ad Code

কারাগারে তার সঙ্গে কিছুই নিতে দেওয়া হয়নি। বই পড়তে দেওয়া হয়নি, টেলিভিশন দেখারও সুযোগ ছিল না। মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য শারীরিক ব্যায়াম করতেন তখন। জিজ্ঞাসাবাদে তাকে বলা হয়, বারুচিনের পোস্টগুলো অনেকটা ‘প্রোটোকলস অব দ্য এলডারস অব জায়নসের’ (বিখ্যাত ইহুদিবিদ্বেষী গ্রন্থ) মতো। এর প্রত্যুত্তরে বারুচিন প্রশ্নকর্তাকে বলেন, ‘আমি একজন ইতিহাসের শিক্ষক। আপনি কি কখনো বইগুলো পড়েছেন?’ প্রশ্নকর্তারা তখন চুপ করে ছিলেন।

চাকরি হারিয়ে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জীবন চালাচ্ছেন বারুচিন। সেটাও শেষ হওয়ার পথে। তার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় জয়ী হলেও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ থেকে পরিত্রাণ পাবেন কিনা জানেন না। বারুচিন বলেন, ‘গল্পটার ব্যাপ্তি আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও বড়।’ কারাগারের অভিজ্ঞতা তার মানসিক সুস্থতাকে ধসিয়ে দেয়নি বলেও জানান বারুচিন। তার মতে, গাজাবাসী এখন তার চেয়েও অনেক বেশি সংকটে আছে।

Manual1 Ad Code

অবজারভারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির আগে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে বারুচিনের সর্বশেষ পোস্ট ছিল একটি সমাধিফলকের ছবি। সমাধিফলকটিকে দেখতে লাগছিল ভাঙাচোরা আসবাবের মতো। সমাধিলিপিতে লেখা ছিল, পরিচয় না জানা এক শহীদ, সবুজ জ্যাকেট এবং প্রশিক্ষক।

বারুচিন বলেন, ‘এই এক ছবিতেই আছে পুরো গল্প। ইসরায়েলের মূলধারার গণমাধ্যম এই ছবি প্রচার করে না। তারা এই ছবি পায় না এবং এই ছবি পেতেও চায় না।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code