জনশক্তি অভিবাসীদের হয়রানি অসঙ্গত

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code

তাসনিম সিদ্দিকী: বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ছয়-সাত লাখ নারী এবং পুরুষ কর্মের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসন করেন। শ্রম অভিবাসীদের পাশাপাশি ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে একটি বড় সংখ্যার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী ও পুরুষ (ডায়াসপোরা) স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। করোনা পরিস্থিতিতে এ দুই ধরনের অভিবাসীরাই গভীর সংকটে পড়েছেন এবং উদ্বেগের সঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন। সৌদি আরব, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার অভিবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকের বৈধ ভিসা নেই- এমন অভিবাসীরা কাজ এবং আয়ের অভাবে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিদেশের মাটিতে মারা গেছেন অনেকেই।

করোনাভাইরাস বিস্তারের সময়টিতে বেশ কিছু অভিবাসী এবং ডায়াসপোরা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ফেরত আসা অভিবাসীরা কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম মানছেন না- এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসীরা নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। অভিবাসী পরিবারগুলোকে একঘরে করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, কোথাও কোথাও অভিবাসীদের ওপর আক্রমণ ও চাঁদাবাজি হয়েছে। চিকিৎসাসেবা নিতে গেলেও তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, করোনা সংক্রমণের উৎস হিসেবে মূলত অভিবাসীদেরই চিহ্নিত করা হচ্ছে। অন্যান্য জনগোষ্ঠী যেমন- ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত যাত্রীদের ব্যাপারে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তারাও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার ভেতরে সেভাবে আসেননি; কিন্তু তা নিয়ে তেমন তোলপাড় হয়নি।

আশা করা যায়, কিছুদিনের মধ্যে বিশ্ব সমাজ করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণ পাবে। তবে করোনাভাইরাস শুধু জনস্বাস্থ্য দুর্যোগই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির যেসব ক্ষেত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তার মধ্যে অভিবাসন অন্যতম। এমনিতেই বাংলাদেশে অদক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমবাজার বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। উপসাগরীয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অদক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ কমানোর জন্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তেলের বাজার, পর্যটন ও ক্যাপিটাল মার্কেটে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও বাহরাইন ইতোমধ্যেই নতুন শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করেছে।

Manual6 Ad Code

গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ১২ শতাংশ এবং সামনে তা আরও কমবে। রেমিট্যান্স প্রবাহে নিম্নগতি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারগুলোতে দেখা দেবে ক্রান্তিকালীন দারিদ্র্য। এসব পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস স্থানীয় বাজারের ওপর প্রভাব ফেলবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদের এখনই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

শোক প্রস্তাব এবং ঋণ প্রদানের জন্য তহবিল গঠন : অভিবাসীরা আশা করছেন, অভিবাসনের দেশগুলোতে করোনাভাইরাসে যারা মারা গেছেন তাদের অবদান তুলে ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শোক প্রকাশ করবে। সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে রপ্তানিমুখী শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য সরকারের পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। একইভাবে বিদেশে কর্মহীন অভিবাসীদের পরিবারের জন্য বিনাসুদে ঋণ ও ক্ষেত্রবিশেষে অনুদানের জন্য তহবিল গঠনও জরুরি।

অভিবাসনের দেশে সুরক্ষা :সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশ জানিয়েছে, নিয়মিত-অনিয়মিত সব অভিবাসীকেই করোনা প্রশ্নে বিনাখরচে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। যেসব দেশ এখন পর্যন্ত অভিবাসী শ্রমিকদের বিনামূল্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষা এবং এর চিকিৎসার জন্য সুযোগ দেয়নি, তাদের অবিলম্বে এই সুযোগ প্রদানের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। এ দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিক এবং অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করাটা কার্যত সে দেশের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তাকেই যে হুমকির মুখে ফেলবে, তা তাদের বোঝাতে হবে। বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো তাদের সীমিত সম্পদ দিয়ে অভিবাসীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা সরকারকে অভিবাসীদের দুর্দশা জানাচ্ছে এবং খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের তহবিল থেকে দ্রুত বাজেট বরাদ্দের দাবি জানাই। অনেক ক্ষেত্রে একই স্থানে বহুসংখ্যক অভিবাসী কর্মী গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। সেখানে ভাইরাস সংক্রমণ বন্ধ করার জন্য নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না। তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেই সঙ্গে তারা নিজেরা কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তা দূতাবাসগুলোকে বাংলা ভাষায় অবহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব অভিবাসী কর্মী গ্রহণকারী দেশের স্বাস্থ্য খাতসহ অন্যান্য জরুরি সেবায় দায়িত্ব পালন করছে, তাদের যথাযথ মাস্ক এবং বিধিসম্মত পোশাকসহ সুরক্ষার সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

Manual2 Ad Code

অভিবাসীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি : সর্বাগ্রে প্রয়োজন অভিবাসীদের মর্যাদা সমুন্নত রেখে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কাজগুলো করা। এ দায়িত্ব সবার- কর্তব্যরত পুলিশ, সেনাবাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, গণমাধ্যম ও এলাকাবাসীর। স্থানীয় পর্যায়ে অভিবাসীদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোর টেলিফোনের মাধ্যমে অভিবাসী পরিবারগুলোতে তাৎক্ষণিক চাহিদা নিরূপণ করা প্রয়োজন। যেসব পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তাদের ইউনিয়ন, উপজেলা ও ডিসি অফিসের খাদ্যগ্রহীতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

রেমিট্যান্সের স্থিতিশীলতা :অভিবাসী কর্মীরা বিদেশ থেকে যেন নিজ পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো অব্যাহত রাখতে পারে, সে জন্য সে দেশে অবস্থিত রেমিট্যান্স প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্নিষ্ট দেশকে আহ্বান জানাতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকার বর্তমানে যে প্রণোদনা দিচ্ছে, করোনাভাইরাসের পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রণোদনার হার বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে।

Manual6 Ad Code

সরকারি বিনিয়োগ : প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড অভিবাসীদের শ্রম গ্রহণকারী দেশে সেবাদানের জন্য অর্থ সরবরাহ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগকে সহায়তা করার জন্য সরকারকে তার বাজেট থেকে ম্যাচিং গ্রান্ট প্রদানের প্রস্তাব করছি। কারণ অভিবাসীরা শুধু তাদের আমানতের টাকা থেকেই সেবা পাবে- এটি নৈতিক নয়। চাই সরকারের বিনিয়োগ।

Manual1 Ad Code

জরুরি অবস্থায় নির্দেশনা-নীতিমালা তৈরি :সংকটকালে শ্রম অভিবাসীর সেবা কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা বা নীতিমালা ইতোপূর্বে গৃহীত হয়নি। করোনাকে কেন্দ্র করে এই নীতিমালা তৈরি হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ২০১৬ সালের অভিবাসন নীতিতে তা সন্নিবেশিত করতে হবে। ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নির্মূল আইন সম্পূর্ণ পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং তাতে অভিবাসীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সংযোজন করতে হবে। এতে করে ভবিষ্যতে যে কোনো প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে অভিবাসীদের জন্য কী করণীয়, তা স্থায়ীভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকবে। জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় অন্যান্য সেক্টরের মতোই অভিবাসীদের বিশেষ বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি এ নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে এবং এর জন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

ন্যায্য পাওনা মেটানো :যেসব অভিবাসী শ্রমিক দুর্যোগের কারণে কর্মচ্যুত হয়েছেন, তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর আগে প্রাপ্য বেতন ও অন্যান্য সুবিধা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

করোনা-উত্তর অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার রোধ :যখন অর্থনৈতিক মন্দায় গন্তব্য দেশে প্রচলিত খাতগুলোতে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা কমে আসার সব ইঙ্গিত রয়েছে, বাংলাদেশে ফেরত আসা অভিবাসী এবং চাকরিচ্যুতদের অনেকেই তখন বিদেশে চাকরি নেওয়ার জন্য মরিয়া হবেন। আমরা আশঙ্কা করছি, এই সুযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও পাচার চক্র সক্রিয় হবে। এ অবস্থা মোকাবিলায় এখন থেকেই সরকারকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একদিকে যেমন প্রশাসনকে দায়বদ্ধ হতে হবে ও অভিবাসনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সচেতনতা বাড়াতে হবে; অন্যদিকে তেমন দেশের মধ্যে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।

ফিরে আসা অভিবাসীদের দক্ষতার ব্যবহার :কয়েক দশক থেকে বাংলাদেশে উৎপাদন খাতে বেশ বড় সংখ্যায় বিদেশি কর্মী কাজ করছেন। তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারের কাছে না থাকলেও বাংলাদেশ থেকে যে রেমিট্যান্স দেশের বাইরে যাচ্ছে, তা থেকে কিছুটা অনুমান করা যায়। প্রতি বছর ভারতে পাঁচ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে। বিদেশি কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি একই ধরনের দক্ষতা নিয়ে যেসব বাংলাদেশি ফিরে এসেছে, তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব। দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসীদের ডাটাবেজ না থাকায় এটি সম্ভব হচ্ছে না। করোনা-উত্তর পরিবেশে এ কাজটি হাতে নেওয়া যেতে পারে। এ লক্ষ্যে অনলাইনে বিশেষ দক্ষতাপ্রাপ্ত কর্মীদের নিবন্ধীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরে বেসরকারি খাতের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code