

সংগ্রাম দত্ত
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জাতীয়করণের এক যুগ পরও বিদ্যালয়টি চলছে এক জরাজীর্ণ টিনসেড ঘরে। নেই পাকা ভবন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য শৌচাগার। চারদিকের চা বাগান ও জঙ্গলের ভেতরে থাকা বিদ্যালয়টি যেন দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
বিদ্যালয়ের বর্তমান চিত্র করুণ। টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে, দরজা-জানালা ভাঙা। বর্ষায় টিন বেয়ে পানি পড়তে পড়তে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা। শ্রেণিকক্ষের মেঝে তখন কাদায় ভরে ওঠে। গরমকালে ঝড়ের মতো গরমে ক্লাসরুমে টিকে থাকা দায়, আর শীতে প্রবল ঠান্ডা নেমে আসে। চা বাগান ও জঙ্গলের পাশে হওয়ায় মাঝেমধ্যেই শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ে সাপ কিংবা অন্যান্য বন্যপ্রাণী। বাউন্ডারি না থাকায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছে গরু-ছাগল আর হাঁস-মুরগির বিচরণস্থল।
এক যুগেও হয়নি পাকা ভবন-
বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু ২০১০ সালের দিকে, দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (ফিনলে) এর তত্ত্বাবধানে ৩৩ শতাংশ জমিতে। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি এটি জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছরেও নির্মিত হয়নি কোনো স্থায়ী ভবন। সম্প্রতি পিইডিপি-৪ প্রকল্প থেকে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সময়মতো দরপত্র আহ্বান ও কাজ শুরু না হওয়ায় অর্থ ফেরত চলে যায়।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ-
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছে ১৫৬ জন শিক্ষার্থী। মাত্র চারটি ছোট কক্ষ ভাগ করে চলছে পাঠদান ও অফিস কার্যক্রম। শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত বেঞ্চ নেই, ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে মাটিতেই বসে পড়তে হয়।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রীতি রবি দাস জানায়, “বৃষ্টির দিনে ক্লাসে পানি জমে যায়, বসতে কষ্ট হয়।”
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃষাণ রবি দাস ও সুরঞ্জিত মৃধা বলেন, “আমাদের রুমে খুব গরম হয়। ওয়াশরুমও নেই। বৃষ্টির দিনে সাপ-জোঁক ক্লাসে ঢুকে পড়ে।”
তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিয়া রানী খাটুয়ালের আক্ষেপ, “বেঞ্চ নাই, টিনের ঘরে গরম লাগে, শীতে আবার ঠান্ডায় কাঁপতে হয়।”
শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতা-
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শান্তনা পাশী বলেন, “ছাত্রছাত্রী অনেক বেশি, অথচ কক্ষ কম। মাত্র ২০ জোড়া বেঞ্চে অর্ধেক শিক্ষার্থীও বসতে পারে না। বাচ্চাদের জন্য কোনো ওয়াশরুম নেই।”
অন্য সহকারী শিক্ষিকা ফাইরুজ তাবাস্সুম জানান, “ঘর ছোট হওয়ায় হোয়াইট বোর্ড রাখা যায় না। প্রজেক্টর থাকলেও ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।”
প্রধান শিক্ষক সবিতা রানী দেব দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আছেন এই বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, “অসংখ্যবার আবেদন করেছি। বরাদ্দ এলেও সময়মতো টেন্ডার না হওয়ায় কাজ শুরু হয়নি।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য-
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩৫টিতেই পাকা ভবন আছে। বাকি তিনটির মধ্যে ভুরভুরিয়া বিদ্যালয় সবচেয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইউসুফ হোসেন খান গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, “পিইডিপি-৪ এর বরাদ্দ সময়মতো ব্যবহার করা যায়নি। আশা করা হচ্ছে, পিইডিপি-৫ এর অধীনে নতুন বরাদ্দ পাওয়া যাবে।”
অদেখা থেকে যাওয়া শিক্ষা-
জাতীয়করণের এক যুগ পার হলেও ভুরভুরিয়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেন অবহেলার এক নিদর্শন। এখানকার শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সংগ্রাম করে পড়াশোনা করছে, কিন্তু উন্নত পরিবেশের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশ্ন থেকে যায়—আর কতদিন এভাবে জরাজীর্ণ ঘরে শিশুদের স্বপ্ন বোনা চলবে?