

সাহিত্য ডেস্কঃ
‘প্রণমামি শিবং শিবঃ কল্প তরুস্ কেশবঃ ধৃতংহ মীনঃ শরীরঃ কেণবঃ ধৃতং নরহরি রূপম জয় জয় দেবহরে,
-হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে, হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে’
শ্লোকটি আজো বাংলাদেশ এবং ভারতের হিন্দু নরনারী ভক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে থাকে, এটি দ্বাদশ শতাব্দীর কবি জয়দেব গোস্বামীর রচিত। তার জন্ম স্থান জয়পুরহাট সদর উপজেলার কেন্দুইল গ্রামে। তিনি রাজা লক্ষণ সেন এর রাজ সভাকবি ছিলেন বলে জানা যায়। তার অমর কীর্তি ‘গীত গোবিন্দ’ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম সাহিত্যের মধ্যে অন্যতম একটি সাহিত্যকর্ম হিসাবে গণনা করা হয়। বিষয়টি জয়পুরহাটের প্রাচীনকাল থেকে সাহিত্যচর্চার প্রমাণ দেয়। এরপর আঠারো শতক পর্যন্ত সাহিত্যচর্চা হলেও এর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী পর্যায়ে কবি জসিম উদ্দীন মুন্সি (১৮৭০-১৯৪৭) কর্তৃক ধর্মীয় বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে রচিত ‘নছিহতে ফুচ্ছাক’ নামক বহুল পঠিত ও জনপ্রিয় পুঁথির সন্ধান মেলে। বাংলা ১৩১২ সালের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে সৃষ্ট বড় ধরনের সংঘর্ষের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে বিভিন্ন প্রকার ছন্দ, গদ্য, কথোপথন, গান-গীতসহ অনন্য বৈশিষ্ট্যের ‘হরাদাশের পুঁথি’ রচনা করেন বাংলা ১৩১৪ সালে প্রয়াত কবি আরিফ শেখ।
মূলত ষাটের দশক থেকে প্রথিতযশা বেশ ক’জন কবি সাহিত্যিক আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কুয়াশা সিরিজখ্যাত ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান, ড. মফিজ চৌধুরী, জসিম উদ্দীন আহম্মেদ, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক কবি আতাউর রহমান, সুর সাধক ও গীতিকবি এ কে এম আব্দুল আজিজ, আব্দুস সাত্তার মৃধা, কাজী রব, রেজাউল করিম চৌধুরী, রোস্তম আলী আহম্মেদ, শাহাদাত হোসাইন ফাররোখ, আব্বাস আলী খান। তাঁদের পথ ধরে আরও যারা জয়পুরহাটের সাহিত্য অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন তারা হলেন; মতিয়র রহমান, মোজম্মেল হক, শাহ রিয়াজ উদ্দীন, গোলাম মহি উদ্দিন চিশতি, শাহ কেরামত আলী চিশতি, আব্দুস ছাত্তার সরকার, এসএম আনসার আলী, শহিদ কবি মাহ্তাব উদ্দীন আহমেদ, উমর আলী, নাজমুস সাকিব, নূর মোহাম্মদ, খন্দকার মাবুবুবর রহমান চিশতি, তাহের সরকার, মোজাম্মেল হোসেন, সৈয়দ এমদাদ আলী দেওয়ান, তেজেশ চৌধুরী, মোজাহার হোসেন জামালী, ডা. শচীন্দ্র নাথ বর্মণ, ইব্রাহীম হোসেন মহব্বতপুরী, নুরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, অধ্যাপক মোহসিন আলী দেওয়ান, অধ্যাপক আব্দুল আলীম, ডা. সুলতান আহম্মদ, এসএম কবেজ, আনোয়ারা রহমান, অধ্যাপক আনোয়ারুল হক, আব্দুর রব সওদাগর, অধ্যাপক আব্দুল আজিজ, নজরুল ইসলাম দিশারী, মো. সামছুজ্জোহা, মাওলানা সাইদুল ইসলাম, মাওলানা ইব্রাহিম হোসেন তর্কবাগিশ, শাহ আনিছুর রহমান, কাজী আহাদ আলী চিশতি, আব্দুল কাফি, কামাল চৌধুরী, সেলিম রেজা, কফিল উদ্দীন আহম্মেদ, আব্দুল খালেক, আমিনুর রহমান, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল বারী জিহাদী, আফছার আলী চেীধুরী, আমানুল্যাহ এফএম. আব্দুল লতিফ চেীধুরী, অমীয় সাহা। সম্প্রতি ইহলোক ত্যাগ করেছেন কবি রোকেয়া লিলি। উল্লেখ্য, উল্লেখিত কবি, সাহিত্যিকরা সবাই পরলোকগমন করেছেন।
বর্তমানে যারা জয়পুরহাটের সাহিত্য অঙ্গকে সরব করেছেন কালাই উজেলায় জন্মগ্রহণকারী মশিউল আলম ববি (ঢাকা অবস্থান), মো. আলাউদ্দীন, নজরুল ইসলাম মণ্ডল, মো. আব্দুল মজিদ, চিত্তরঞ্জন দেবনাথ, শফিউল বারী রাসেল, আহম্মেদ রব্বানী, আনিস রহমান, হামিদুল হক, এনামুল হক, শরিফুল হক সোহেল, মোমিন উদ্দীন, সালেহ আকরাম মেরিন (ইটালী প্রবাসী), হোসাইন ইকবাল, আব্দুল হাকিম, রূপা রহমান, শাপলা খাতুন, রওশনারা পারভীন, মোহাম্মদ আলী মাছুম, মিজানুর রহমান। ক্ষেতলাল উপজেলায় লেখালেখির সঙ্গে যারা এখনো রয়েছেন তারা হলেন : কাজী অরূপ, আমিনুর আকাশ, সাখিদার আলম, শফিক সিদ্ধার্থ, ফিরোজ পাটোয়ারি, মুনছুর রহামন বাবু, গোলাম রব্বানী, দেওয়ান শাহজাহান সিরাজ, তোজাম্মেল হোসেন, আল আমিন খান, আনোয়ার হোসেন টুটুল। তরুণ কবি মারুফ আহমেদ নয়ন ইতোমধ্যে আধুনিক বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছেন। পাঁচবিবি উপজেলার কবি সুজন হাজারী, আমিনুল হক বাবুল এবং মাসুদার রহমান জাতীয় পর্যায়ে তাদের আসন নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচবিবির সাহিত্য অঙ্গনে যারা সরব রয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারুনুর রশিদ মিঞা, আব্দুল বাকি, জয়নুল আবেদীন আমহমুদ, জলিলুর রহমান জলিল, নূর জাহিরুল, তোয়াবুর রহমান তোয়া, পরিনা পিএস, রফিকা খানম, কবিতা পারভীন, দেওয়ান রাসেল, হেলাল মানসুর, কৃষিবিদ রতন মাহমুদ, পলাশ স্বর্ণকার, আবু সিদ্দিক সরকার, নাজমুল আহসান, জেসমীন দীপা (ঢাকা অবস্থান), আমিনুর রহমান আমিন, প্রিন্সিপাল মফিজ উদ্দীন, এনামুল হক। জয়পুরহাট সদরের মুস্তাফা আনসারী এবং যতন কুমার দেবনাথ ইতোমধ্যেই ছড়াকার হিসেবে দেশব্যাপী বেশ সুনাম কুড়াতে সক্ষম হয়েছেন। এ ছাড়া যারা সাহিত্য নিয়ে রয়েছেন তারা হলেন; মাহফুজুর রহমান, অরবিন্দ সরকার, আজিজুল হক বিশ্বাস, জ্যোতির্ময় রায় স্বপন, আব্দুস সবুর শাহ, রফিকুর রহমান হিরো, টপি এনামুল হক, ওহাব মল, শাহ নেওয়াজ, ইকবাল হোসেন, সেলিম চেীধুরী, মানিক শিমুল, রতন মণ্ডডল, সা’দ আবদুল ওয়ালী, নাজমুস সায়াদাত, লালন হোসেন, শামীম নাজির আহম্মেদ, রানী আর্শিনা ফেরদৌস, মন্জুর মুকাদ্দাস, খাজা শামসুল আলম বুলবুল, আহমেদ মকবুল মুকুল, আহমেদ মোশারফ নান্নু, অধ্যাপক আনোয়ার পান্না, ফরিদুর রহমান বাবুল (ঢাকা), নাসরিন রিংকু, রাবিউল সাধন, মীর আবদুর রহিম, রবিউল ইসলাম সোহেল, আদম মোহাম্মদ, বিএম সাইদুল, অদিতি রায়, মো. আনোয়ার হোসেন, মোজাফ্ফর হোসেন, আহসান হাবিব মুন, নির্ঝর, আমিনুর রহমান টিপু, মোস্তাফিজারর রহমান, মাজেদ রহমান, ম আ রউফ আর্ট, তহুরা দেওয়ান, মিজানুর রহমান মিজান।
জয়পুরহাটের আধুনিক সাহিত্য ছাড়াও লোক সাহিত্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা। জেলার রয়েছে নিজস্ব সাহিত্য ভান্ডার: ছড়া, শিকলি, পুথি, মুর্শিদী গান, ধুয়া গান, পালাগান, কেচ্ছা ইত্যাদি। তবে, এ জেলার বিয়ের গীত অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলার লোক সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ বিলুপ্ত সম্পদ ভাট কবিতা। এসব কবিতা বুক সাইজে আট পৃষ্ঠার ফোল্ডিং করে ছাপানো। হাটে বাজারে কবিয়ালরা এসব কবিতা সুর করে পড়ে যেতেন বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে। সমসাময়িক কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা, প্রেম কাহিনি, চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড, সমকালীন প্রসঙ্গ, উন্নয়ন, দেশাত্মবোধ, দুর্যোগ, মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদি বিষয়ের পটভূমিতে লেখা হতো এই ভাট কবিতা। কেউ এটাকে পথ কবিতা বা হাটের কবিতাও বলে থাকে। জয়পুরহাটে এই ভাট কবিতার প্রভাব ছিল বেশ জোড়ালো। জেলার পাঁচবিবি উপজেলার প্রয়াত কবি উমর আলী ছিলেন একজন প্রতিভাবান ভাট কবিতার লেখক। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ভিত্তি ‘ছয়দফা’ এবং ‘ভোটের জারী’ শিরোনামের ভাট কবিতা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। তিনি ছাড়াও আক্কেলপুরের কবি আলতাফ হোসেন, পাঁচবিবির রইচ উদ্দীন, ফজলুর রহমান : কালাই উপজেলার আজিম উদ্দীন ভাট কবি।
জয়পুরহাটের সাহিত্যিকদের লেখালেখির পাশপাশি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারে বেশ কাজ করেছে। প্রয়াত সাহিত্যিক শাহাদত হোসাইন ফাররোখের সম্পাদনায় ‘অভিযান’ পত্রিকায় দেশের প্রথিতযশা লেখকরা লিখতেন। পরবর্তীকালে জয়পুরহাট সদর থেকে খ ম আবদুর রহমান রনি ও রতন কুমার খাঁর ‘দিগন্ত’, মুসতাফা আনসারী ও যতন কুমার দেবনাথের অংকুর, বিনয় সরকারের ‘উঠোন’, মাহমুদুল ইসলামের ‘প্রবাহ’, আহমেদ মোশারফ নান্নুর ‘বাউল’ সহ অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিন যথাক্রমে ‘তারুণ্য’,‘ সেবক’, ‘চোখ’, ‘হালখাতা’, ‘উন্মোচন’, ‘প্রজন্ম’, ‘উচ্চারণ’, চাঁদেরহাট’, ‘বাঁশি’, ‘অনুপ্রাস’, ‘দ্যুতি’সহ বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন জয়পুরহাটের সাহিত্য ও লেখক সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। বর্তমানে ‘ শিঞ্জন’ এবং ‘জট’ ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। শুধু যে জয়পুরহাট সদরেই সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন বের হতো তা নয়। জেলা সদরের বাইরে আক্কেলপুর উপজেলায় ‘অলংকার’ ও ‘সপ্তদীপা’, ক্ষেতলাল উপজেলায় অনুবন্ধ, অঙ্কুর, বিজয় স্মরণীকা, দিঘী, চন্দ্রালোক, ঢাক এবং কালাই উপজেলা থেকে আলো, কালাইয়ের একাল ও সেকাল, প্রত্যাশিত দীপ এবং উত্তরণ কণ্ঠ নামক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। পাঁচবিবি উপজেলা থেকে মহুয়া, উপহার, বালিঘাটা, ছয়শো সাতাত্তর বাই বত্রিশ নামের লিটল ম্যাগাজিন বের হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচবিবির সুপার ঈগল সাহিত্য পরিষদ একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করেছিল বলে প্রকাশ। সাম্প্রতিককালে সাহিত্য সংগঠনগুলো নিয়মিত সাহিত্য আসর করাসহ লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করায় নতুন নতুন লেখক তৈরি হচ্ছে। আবার লেখকদের উৎসাহিত করতে সন্মাননা প্রদান করা, সাহিত্য আড্ডার আয়োজন প্রায়শই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সর্বোপরি সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জেলার লেখক, কবিদের একটা সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে বলা যায়।