

ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রায় অটল। ভৌগোলিক সান্নিধ্য, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কানাডিয়ানদের চোখে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পাল্টে যাচ্ছে।ওয়াশিংটনভিত্তিক পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, এখন মাত্র ৩৪ শতাংশ কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে অনুকূলভাবে দেখছেন। এক বছর আগেও এই হার ছিল প্রায় ৫৪ শতাংশ অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমেছে ২০ শতাংশ পয়েন্ট।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, একই সময়ে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ঠিক ৩৪ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতি কানাডিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গি এখন প্রায় সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল।বিশ্লেষকদের মতে, এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক মাস ধরে কানাডার ওপর শুল্ক আরোপ এবং কানাডাকে নিয়ে প্রকাশ্যে অবমাননাকর মন্তব্য দেশটির জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প বারবার কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে হেয় করার চেষ্টা করেন। কখনো তাকে “গভর্নর” বলে সম্বোধন করেছেন, আবার কখনো দাবি করেছেন কানাডা যেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়। কানাডিয়ানদের কাছে এসব মন্তব্য ছিল গভীর অবমাননার প্রতীক। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক শুল্কনীতি কানাডার অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করে।ফলে ২০১৯ সালের এক জরিপে যেখানে ৮৭ শতাংশ কানাডিয়ান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নতুন সমীক্ষায় এই হার নেমে এসেছে ৬৭ শতাংশে।
এই প্রবণতা শুধু কানাডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পিউ-এর সমীক্ষায় ২৫টি দেশের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দেশে মানুষ জানিয়েছেন, চীনের প্রতি তাদের ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে ২৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখেন। অপরদিকে ট্রাম্পের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন মাত্র ২২ শতাংশ।সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে মেক্সিকোতে। সেখানে এখন ৪৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ২০১৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।
জরিপটি পরিচালিত হয়েছে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত, যেখানে ২৪টি দেশে ২৮ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আলাদাভাবে আরও ৩,৬০৫ জনকে নিয়ে জরিপ চালানো হয়।ফলাফলে স্পষ্ট, শুধু কানাডা নয়, বিশ্বব্যাপীই যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। যার ফলে অনেক দেশ বিকল্প শক্তি হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে।
কানাডিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন আসলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন। একসময় যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া দেশগুলো এখন বিকল্প হিসেবে চীনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত।কানাডার মতো দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের মধ্যেও যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটনের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।