

অসীম বিকাশ বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে পূজনীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ওপর শারীরিক হামলা ও অবমাননার ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেবল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, বরং সমগ্র সমাজের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। এমন এক দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলাধীন পাচখাইন জেতবন শান্তিকুঞ্জ বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ এবং বাংলাদেশ ভিক্ষু মহাসভার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, ড. প্রিয়দর্শী মহাথের। তাঁর উপর ঘটে যাওয়া শারীরিক হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং এটি পবিত্র গেরুয়া ভূষণের প্রতি ক্রমবর্ধমান অসম্মান ও অবমাননার এক করুণ চিত্র। এই প্রতিবেদন সেই গভীর সংকটের দিকে আলোকপাত করছে, যেখানে ভিক্ষু জীবনের ত্যাগ ও মর্যাদা আজ প্রশ্নের মুখে।
ঘটনাক্রম ও তার নেপথ্যের কারণ:
সিসিটিভি ফুটেজে ধারণকৃত একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, আসন্ন কঠিন চীবর দান উৎসবের কমিটি ও অর্থ উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ড. প্রিয়দর্শী মহাথের-এর ওপর কিছু ব্যক্তি শারীরিক হামলা চালাচ্ছে। ঘটনাটি অত্যন্ত নিন্দনীয়, কারণ এটি কোনো সাধারণ বিবাদ নয়; এটি পূজনীয় একজন ভিক্ষুর ওপর সরাসরি আক্রমণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ধর্মীয় কাজের জন্য অর্থ সংগ্রহের মতো একটি পবিত্র বিষয়কে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে। এখানে স্পষ্টতই লোভ, ক্ষমতা এবং অর্থলিপ্সা ধর্মের পবিত্রতাকে ম্লান করেছে। যখন দায়ক ও ভিক্ষুর সম্পর্ক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়, তখন এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার সৃষ্টি হয়।
ভিক্ষু জীবনের বাস্তবতা ও গভীর সংকট:
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবন ত্যাগ, সেবা এবং সদ্ধর্ম প্রচারে নিবেদিত। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পবিত্র জীবনের বাস্তবতাকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ড. প্রিয়দর্শী মহাথের-এর মতো একজন প্রবীণ ও সম্মানিত ভিক্ষু, যিনি ৩০-৩৫ বছর ধরে নিরলসভাবে ধর্ম ও সমাজের সেবা করে চলেছেন, তাঁকেও এমন নির্মম লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। এটি ছোট ভিক্ষুদের মনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। তাঁরা দেখছেন, সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে থাকা ভান্তেদেরও কীভাবে অভাব-অভিযোগ, অবমাননা ও বৈষম্যের যন্ত্রণায় ভুগতে হয়। এই বাস্তবতা তরুণ ভিক্ষুদের মনে হতাশা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে, যেন তাঁদের গেরুয়া জীবন দিকহীন এক নৌকার মতো।
গেরুয়া ভূষণের প্রতি অবজ্ঞা ও সামাজিক অবক্ষয়:
এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। যে সমাজে পূজনীয় ভিক্ষুকে সম্মান জানানো দূরে থাক, বরং তাঁদের ওপর শারীরিক আক্রমণ করা হয়, সেই সমাজের বিবেক কোথায়? এটি স্পষ্টতই ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে নির্দেশ করে। গৃহী কর্তৃক পূজনীয় ভিক্ষুর ওপর হামলা এবং পবিত্র ত্রি-চীবরকে অপমান করার এই প্রবণতা যদি রোধ করা না যায়, তাহলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মর্যাদা সম্পূর্ণভাবে ভূলুণ্ঠিত হবে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:
এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং কঠোর শাস্তির বিধান করা। একই সাথে, ভিক্ষু সংঘ এবং দায়ক উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ধর্মের নামে অর্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করার জন্য সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ড. প্রিয়দর্শী মহাথের-এর ওপর হামলার ঘটনাটি একটি অশনিসংকেত। এটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে লোভ, ক্ষমতা এবং লালসা একটি পবিত্র সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। যতক্ষণ না আমরা এই অবক্ষয় রোধ করতে পারছি, ততক্ষণ গেরুয়া ভূষণের প্রকৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনা কঠিন। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, সমাজ এবং ভিক্ষু সংঘ উভয়কেই নিজেদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে, যাতে ভবিষ্যতেও আর কোনো পবিত্র গেরুয়া জীবন এমন অসহায়ত্বের শিকার না হয়।