তালেবানের হাতে আফগানিস্তান

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual2 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ বিদেশি সেনারা আফগানিস্তান ছাড়ার এক বছরের মাথায় রাজধানী কাবুল তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে—নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের এমন আশঙ্কা অনেকেই আমলে নেননি। কিন্তু বাস্তবে যেটা ঘটল, তা সব ভবিষ্যদ্বাণীই ওলটপালট করে দিল। কট্টর ইসলামপন্থী সংগঠনটি যে শক্তি দেখাল, তাতে আফগান সরকার তাদের কাছে নতি স্বীকার করল বিদেশি সেনারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার আগেই।

তালেবানের এমন ‘আচমকা’ সাফল্য এরই মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে; পরিষ্কার করেছে কিছু বাস্তবতাও। জঙ্গিবাদ দমনের নামে গত দুই দশক যুক্তরাষ্ট্র সেখানে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে সেই অভিযান নিয়ে। এ ছাড়া গত ২০ বছরে আফগানদের সামনে তালেবানের কট্টর মতাদর্শকে যে এতটুকু খাটো করা যায়নি, তা-ও এখন ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ১২টায় যখন এই প্রতিবেদন লেখা হয়, তখন তালেবান যোদ্ধারা কাবুলের বিভিন্ন চেকপোস্টের দখল নিচ্ছিল। এ ছাড়া তালেবানের হাতে ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ ক্ষমতা ছাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছিল প্রেসিডেন্ট প্যালেসে। গতকাল সন্ধ্যার দিকেই প্রেসিডেন্ট প্যালেস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোল্লা আব্দুল গনি বরাদরের নাম শোনা যাচ্ছে। তিনি মোল্লা ওমরের সহযোগী ছিলেন এবং মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। এদিকে প্রেসিডেন্ট গনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ ছেড়ে পাশের তাজিকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য প্রেসিডেন্টের দপ্তরে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে আশরাফ গনির গতিবিধি সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তালেবানের একজন মুখপাত্র বলেছেন, আশরাফ গনি এখন কোথায়, তাঁরা সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যম টোলো নিউজ তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও কাবুল ত্যাগ করেছেন বলে অন্তত দুটি সূত্র তাঁদের নিশ্চিত করেছে।

এর আগে আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিসমিল্লাহ মোহাম্মদি বলেছিলেন, এই সংকট মেটানোর দায়িত্ব দেশের রাজনীতিবিদদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট গনি।

Manual6 Ad Code

গতকাল দুপুরে তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকার যেন শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, সে জন্য তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের যোদ্ধারা কাবুলের প্রবেশপথে অবস্থান করবে।’

প্রায় একই সময় আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল সাত্তার মিরজাকওয়াল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘অন্তর্বতী সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তালেবান নিশ্চিত করেছে যে তারা কাবুলে হামলা চালাবে না।’

কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থানরত এক তালেবান নেতা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, কাবুলে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে, সে জন্য তালেবান যোদ্ধাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যারা কাবুল ত্যাগ করতে চায়, তাদেরও বাধা দেওয়া হবে না।

কাবুলের উপকণ্ঠে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটি দখলের দাবি জানিয়েছে তালেবান। গত ২০ বছরে মার্কিন অভিযানের মূল কেন্দ্র ছিল এই বিমানঘাঁটি।

তালেবানের হাতে আফগানিস্তানের ‘প্রায় পতনের’ খবরের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না। তবে মার্কিন নাগরিকরা যাতে নির্বিঘ্নে আফগানিস্তান ছাড়তে পারে, সে জন্য আরো এক হাজার মার্কিন সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বর্তমানে সেখানে চার হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এ মাসের মধ্যেই সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো।

আফগান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশন ডেকেছে ব্রিটিশ সরকার। আগামী বুধবার এই অধিবেশন বসবে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতেই এই অধিবেশন ডাকা হয়েছে।

Manual4 Ad Code

গতকাল সকাল থেকেই আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। গতকাল সন্ধ্যার দিকে মার্কিন কূটনীতিকদের বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, দূতাবাস ছাড়ার আগে মার্কিন কূটনীতিকরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়িয়ে ফেলছেন। মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে যে কাবুল বিমানবন্দরের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। তবে আগ্রহীরা যাতে নির্বিঘ্নে আফগানিস্তান ছাড়তে পারে, সে জন্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাটো সদস্যরা সহযোগিতা করছেন।

গত ২০ বছরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি, যথাক্রমে তিন হাজার ও এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার।

এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল তালেবান। এরপর মার্কিন হামলার মুখে তারা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। গত দুই দশকে ক্ষমতায় না থাকলেও রাজনীতির মাঠ ছাড়েনি তালেবান। প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় তাদের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। গত ১ মে বিদেশি সেনারা আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করলে দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় তালেবানের। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে ৩৪টির মধ্যে ২৫টি প্রদেশ দখল করে নেয় সংগঠনটি। গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে বাকি ছিল শুধু রাজধানী কাবুল। সেটাও এখন তাদের কবজায়।

মাস তিনেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিদেশি সেনারা চলে যাওয়ার এক বছরের মাথায় কাবুলের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে যেতে পারে। এই ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ওই সময় হোয়াইট হাউস জানায়, অন্যান্য প্রদেশের দখল নিতে পারলেও তালেবান এক বছরের মধ্যে কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না। যুক্তি হিসেবে বাইডেন প্রশাসন জানায়, আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা গত দুই দশকে অনেক বেড়েছে। তবে মার্কিন সহায়তা ছাড়া আফগান সেনারা যে কতটা দুর্বল, তা গত এক সপ্তাহেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। গত এক মাসে কয়েক হাজার সেনা পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পাশের দেশ তাজিকিস্তানে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবানের আসার কথা শুনে হাজার হাজার মানুষ কাবুল ছাড়তে শুরু করেছে। অথচ কয়েক দিন আগে হাজার হাজার মানুষ তালেবানের ভয়ে অন্যান্য শহর ছেড়ে এই কাবুলে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, এসব মানুষ শহর ছাড়ছে ঠিকই, কিন্তু কোথায় আশ্রয় নেবে, তা তারা নিজেরাও জানে না। কারণ প্রায় পুরো দেশই এখন তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো নব্বইয়ের দশকে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। মূলত ওই সময়ই পাশতুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তালেবান। শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার শহরের আশপাশে আধিপত্য ছিল তাদের। স্থানীয় পাশতুন ভাষায় ‘তালেবান’ শব্দের অর্থ হলো শিক্ষার্থী।

Manual4 Ad Code

সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা চলে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে যে কয়েকটি পক্ষের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বাধে, তালেবান ছিল তাদের একটি। তালেবানের অর্থের মূল উৎস দেশটির খনিজ সম্পদ। বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী এই সশস্ত্র সংগঠনের কবজায় রয়েছে আফগানিস্তানের ১৮টি খনি।

আফগান সেনাদের অসহায় আত্মসমর্পণের জন্য আফগান রাজনীতিকদের দায়ী করছেন অনেক সামরিক কর্মকর্তা। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্বাস তাওয়াকলি বলেন, ‘সামরিক যুদ্ধের ফলে কোথাও পরাজয় ঘটে না, পরাজয় ঘটে মানসিক যুদ্ধের ফলে।’

আফগান পাইলটরা বলছেন, তাঁদের রাজনীতিকরা যুদ্ধবিমানের যান্ত্রিক সক্ষমতার দিকে যতটা নজর দেন, ততটা নজর পাইলটদের দিকে দেন না।

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেয় তালেবান প্রশাসন। তাদের সময় নারীদের লেখাপড়া কিংবা চাকরির সুযোগ ছিল না। এ ছাড়া পুরুষ অভিভাবক ছাড়া তারা ঘরের বাইরেও যেতে পারত না। তবে এবার ক্ষমতায় এলে নারীর অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তালেবান।

বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া : আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েকটি দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জাহিদ হাফিজ চৌধুরী বলেন, ‘আফগানিস্তানের পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা এখনো নিজেদের দূতাবাস বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’

অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গ বলেন, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা আজ বা কাল ইউরোপে ছড়াবে, বাদ যাবে না অস্ট্রিয়াও। আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি ত্রাণ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

আফগান শরণার্থীদের ইউরোপে প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশনার মার্গারিতিস শিনাস বলেন, ‘ইউরোপে যে অভিবাসন ও শরণার্থী আইন আমাদের প্রয়োজন তা গ্রহণ করতে আমাদের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।’

তালেবানের কাবুল প্রবেশের আগে গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী যদি নিজেদের দেশকে রক্ষা করতে না পারে তাহলে এক বছর বা আরো পাঁচ বছর মার্কিন সেনাদের সেখানে উপস্থিতি কোনো পার্থক্য গড়বে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো দেশে মার্কিন উপস্থিতি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’

আফগানিস্তানে সংঘাত নিরসনে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আফগান সংকট নিয়ে অন্যদের মতো আমিও উদ্বিগ্ন। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যাতে অস্ত্রের দিন শেষ হয় এবং আলোচনার টেবিলে সমাধান মেলে।’ সূত্র : এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স।

Manual4 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code