তীব্র সক্ষমতা সঙ্কটে দেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাপেক্স

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। বরং দীর্ঘদিনের অবহেলায় রুগ্ন হয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও কার্যক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানির তুলনায় বাপেক্সের সাফল্য বেশি। বিদেশী কোম্পানিগুলো প্রতি ৪টি কূপ খননে একটিতে গ্যাস পেলেও বাপেক্স দুটি কূপ খনন করে একটিতে গ্যাস পাওয়ার সাফল্য পেয়েছে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বাড়ানোর দিতে সরকার তেমন নজর দিচ্ছে না। বরং প্রতিষ্ঠানটিতে পুরোনো ও প্রয়োজনের তুলনায় কম রিগ (কূপ খননযন্ত্র) দিয়েই চালানো হচ্ছে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। তাছাড়া সংস্থাটির জনবল না বাড়ানো এবং দীর্ঘসময় ধরে সরকারি অর্থায়ন না হওয়ায় ক্রমেই প্রতিষ্ঠানটি আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে। বাপেক্স সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

Manual8 Ad Code

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে বাপেক্সের রিগের সংখ্যা ৫। কিন্তু ওই রিগুগুলোর কোনো সার্টিফিকেট নেই। তাছাড়া রিগগুলো গড়ে ১০ থেকে ২৫ বছরের পুরোনো। ফলে বাপেক্সকে বাধ্য হয়েই দেশে কূপ খননের কাজে পুরোনো রিগগুলো ব্যবহার করতে হচ্ছে। যদিও ইতিমধ্যে দুটি আধুনিক অনুসন্ধান কূপ খনন রিগ কেনার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি রিগ কেনার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। আর ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার আরেকটি রিগ কেনার জন্য একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার আগামী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাস কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সাড়ে ৪ হাজার লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক এবং ৪২শ’ বর্গকিলোমিটারে ত্রিমাত্রিক সিসমিক সার্ভে চালাচ্ছে। বর্তমানে বাপেক্সে সর্বোচ্চ দুটি রিগ চালানোর মতো জনবল রয়েছে। অথচ টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা দ্রুত অর্জন করা সম্ভব নয়। ন্যূনতম চার-পাঁচটি কূপে কাজ করার পর নতুনদের দক্ষতা তৈরি হয়। তাছাড়া দেশের তীব্র জ্বালানি সঙ্কটে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা জরুরি। গ্যাস অনুসন্ধানে বিগত সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিলেও বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে তেমন নজর দেয়নি। অথচ দেশে বিদ্যমান গ্যাস কূপের অনেকগুলোই আবিষ্কার করেছে বাপেক্স।

সূত্র জানায়, দেশের সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের নিজস্ব কোনো জাহাজ নেই। এমনকি আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট লাগে তাও নেই। বিনিয়োগেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি কোনো প্রকল্পের অনুমোদন পেতেও সংস্থাটিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পড়তে হয়। তাছাড়া বাপেক্সের কর্মীরা বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেলের চেয়ে কম বেতন পায়। যে কারণে মেধাবীরা বাপেক্সের কাজে আগ্রহী না হয়ে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিতে উচ্চবেতনে চাকরি করার জন্য চলে যায়। সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়াতে হলে প্রথমেই রিগ কেনার কথা আসে। কিন্তু নতুন যে রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে তার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। সেজন্য দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী বাপেক্সের জনবলের যে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট তাও ওই সংস্থার নেই। বর্তমানে বাপেক্সের পাঁচটি রিগের মধ্যে দুটি ওয়ার্কওভার কাজের জন্য আর তিনটি ড্রিলিং রিগ। কিন্তু ওই রিগগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই সংস্থায়। অথচ ড্রিলিং সাইটে ২৪ ঘণ্টাই জনবল লাগে। বিদেশি কোম্পানিগুলো বছরে সাত থেকে আটটি কূপ খনন করলেও দক্ষ জনবলের অভাবে বছরে মাত্র একটি কূপ খনন করে বাপেক্স। তবে বর্তমান সরকার বাপেক্সের উন্নয়নে উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে জনবল নিয়োগের জন্য একটি কমিটি হয়েছে। তবে ফল পেতে কমপক্ষে দেড়-দুই বছর লাগবে।

সূত্র আরো জানায়, গ্যাস অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক মানের করতে বাপেক্সের জিওলজিক্যাল ও জিওফিজিক্যাল বিভাগের কার্যক্রমে নতুন সফটওয়্যার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বাপেক্সে যে থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করা হয়, তার বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার রয়েছে। সেগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট করতে হয়। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করতে হলে বাপেক্সের জন্য থ্রিডি প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ প্রয়োজন। কিন্তু ওই ধরনের কোনো জাহাজ বাপেক্সের নেই। বরং সেক্ষেত্রে বাপেক্সকে নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে সহায়তা নেয়ার কথা বলা হয়। তাছাড়া গ্যাস কূপ খননপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করতে হয়। যা বাপেক্সের বোর্ডে ওঠে আর বোর্ড অনুমোদন দিলে তারপর পেট্রোবাংলার বোর্ডে যায়। সেখানে অনুমোদন দিলে মন্ত্রণালয়ে যাবে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থের সংস্থান করতে হয়। তারপর প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে বেশ কিছু বৈঠকের পর একনেকে যাবে। একনেক অনুমোদন দিলে ডিপিপি আসবে। তারপর টেন্ডার হবে এবং কূপ খনন শুরু হবে। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বছরে একটি কূপও খনন করা সম্ভব নয়। অথচ বাপেক্সের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ থাকলে বছরে তিনটি করে কূপ খনন করা সম্ভব। তাছাড়া কূপ খননের ভূমি প্রস্তুত থাকলে কূপ খনন সহজ হয়, তা না হলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে দুই বছর লেগে যায়।

Manual2 Ad Code

এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে একটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সংস্থাটির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। দ্রুত বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে হলে বিশ্বব্যাপী মেধাবীদের খোঁজ করে উচ্চবেতনে নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করতে যে জ্ঞান দরকার, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাপেক্সের কর্মকর্তাদের শিখতে হবে।

Manual6 Ad Code

অন্যদিকে বাপেক্স প্রসঙ্গে সমপ্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, বিগত স্বৈরাচারের সময় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে রীতিমতো পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। ফলে অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান বা আমদানিনির্ভরতার কারণে বর্তমানের জ্বালানিসংকট সৃষ্টি হয়। বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে আরো দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে।

Manual2 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code