

সম্পাদকীয়: মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতের কারণে ইরানের প্রতিবেশীদের মধ্যে অত্যন্ত উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তুরস্কও অস্বস্তির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এ পর্যন্ত অবশ্য বড় ধরনের সঙ্ঘাত এড়ানো গেছে। তুরস্কসহ ইরানের প্রতিবেশীরা এতে কিছুটা হলেও উদ্বেগমুক্ত হয়েছে। কারণ এ অঞ্চলে কেউ আরেকটি যুদ্ধ দেখতে চায় না। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে আঙ্কারা ও তেহরানের মধ্যে পরিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং উভয় দেশ ভালোভাবে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বা সঙ্ঘাত ওই অঞ্চলে তুরস্কের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। অবশ্য এতে তুরস্ক একটি আঞ্চলিক সংলাপে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পেতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতে তুরস্কের জন্য বিপদ এবং সুযোগ-সুবিধা লাভ উভয় ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকার প্রেক্ষাপটে ইরান-তুরস্ক সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করার জন্য একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকানো যাক।
শত শত বছর ধরে যদিও বারবার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও গত ৪০০ বছর ধরে এই দুই দেশের সীমান্ত অপরিবর্তিত রয়েছে। উভয় দেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে তুর্কি-ইরানি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বে¡ও উভয় দেশ ১৬৩৯ সালের কাসর-শিরিন চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। ওই চুক্তির মাধ্যমে অটোমান এবং পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে ১৫০ বছরের সঙ্ঘাতের অবসান ঘটে। অনেক বিশ্লেষক বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এই দীর্ঘ ইতিহাস বুঝতে পারেননি। তারা তুর্কি ও ইরানের মধ্যে বন্ধুত্ব অথবা শত্রুতার ভিত্তিতেই দুই দেশকে মূল্যায়ন করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলোÑ ইরান-তুরস্ক সম্পর্ক সবসময় জটিল এবং বহু দিক দিয়ে এবং বিভিন্ন বিবেচনায় প্রভাবিত হয়ে থাকে। গত ২০ বছরে ইরান-তুরস্ক সম্পর্ক বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘটনায় প্রভাবিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকব্যাপী তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন তুরস্কে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানকে ইরান সরকার কর্তৃক রফতানি করা বলে চিহ্নিত করেছে।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের ব্যাপারে তুরস্ক তীব্র বিরোধিতা করে এবং ইরাকে হামলা চালানোর জন্য তুরস্কে প্রবেশের অনুমতি দানে অস্বীকৃতি জানায়। ইরাক ও ইরানে হামলা চালাতে তুর্কি ভূখণ্ড ব্যবহারের জন্য আমেরিকা অনুমতি চাইলে তুরস্ক নাকচ করে দেয়। তুরস্কের এই মনোবৃত্তিকে ইরান আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। আবার আমেরিকা সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করলে তুরস্ক তার একটি বন্ধুভাবাপন্ন সরকারকে হারায়। কারণ সাদ্দাম সরকার কুুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) বিরুদ্ধে সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলা চালানোর জন্য তুরস্ককে অনুমতি দিয়েছিল। অপর দিকে সাদ্দামকে আমেরিকা ক্ষমতাচ্যুত করলে ইরান খুশি হয়। কারণ একটি গুলি খরচ না করেও তেহরান তার পুরনো শত্রুর বিরুদ্ধে জয়লাভে সক্ষম হয়।
ইরাকে মার্কিন হামলার পর ইরাকের উত্তরাঞ্চলে একটি স্বাধীন কুর্দিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ব্যাপারে তুরস্ক উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। এ সময় ইরাকি সুন্নিদের ভাগ্য নিয়েও তুরস্ক উদ্বেগ প্রকাশ করে। কারণ তেহরান বাগদাদের ক্ষমতায় শিয়াপন্থীদের বসানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠে এবং শিয়াদের ক্ষমতার ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য দেশটিতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উপস্থিতি জোরদার করে।
উভয় দেশের মধ্যে নতুন করে ওই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে কিন্তু তাদের মধ্যে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। প্রকৃতপক্ষে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সাত বছর পর তুরস্ক-ইরান সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। ২০২০ সালে আঙ্কারা তেহরানকে একটি পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে বুঝাতে সক্ষম হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী ইরানি কর্তৃপক্ষ তুরস্কের কাছে ইউরেনিয়াম পাঠাতে সম্মত হয়। আর তুরস্ক এর বিনিময়ে নিউকিয়ার ফুয়েল রড সরবরাহ করতে রাজি হয়। ইরানের রিচার্স রিঅ্যাক্টরে গবেষণার জন্য তুরস্ক এই রড সরবরাহ করে। তুরস্কের সাথে এই চুক্তি করার কারণে ওবামা প্রশাসন তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরওপ করে। পরমাণু চুক্তির কারণে বিপর্যয় ছাড়াও ২০১০ সালে অন্য দু’টি কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। তেহরান ও ওয়াশিংটনের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে নুরী আল মালিকি দ্বিতীয়বার ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনয়ন লাভ করা এবং আরববসন্তের সূচনা হওয়ার কারণে।