দুর্বল বাঁধ,অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পাহাড়ি ঢল,ডুবে যাওয়া স্বপ্ন এবং হাওরের বাস্তবতা

লেখক: Rumie
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

Manual8 Ad Code

শরীফ আহমেদ,ডেস্ক রিপোর্ট:সিলেট অঞ্চলের ছোট-বড় প্রায় সব হাওরই কয়েক দিনের পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে শুধু পাকা ধান নয়; ডুবে গেছে কৃষকের স্বপ্ন, বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা আশা। মাঠের ফসলের সঙ্গে ভেসে গেছে জীবনের হিসাব-নিকাশও। বাস্তবে কত ধান কাটা হলো, কতটুকু ক্ষতি হয়েছে- এর প্রকৃত হিসাব কৃষক ছাড়া আর কেউই যেন জানে না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিসংখ্যান অনেক সময়ই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, ফলে আস্থার জায়গাটাও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মাঠপর্যায়ে তৎপরতা কম, জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্ট, এমন অভিযোগ কৃষকদের মুখে মুখে। অথচ এই দুর্যোগে তাদের পাশে থাকার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি।

Manual7 Ad Code

পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওড়ে বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে হাজারো কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বুক ও হাঁটুসমান পানি ভেঙে তারা কোনোমতে নষ্ট ধান ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন; যার মর্মস্পর্শী দৃশ্য ইতোমধ্যেই গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ২,৪৯৭ হেক্টর জমির বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে এবং প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংখ্যাটা বড়, কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একেকটি ভেঙে পড়া পরিবার, একেকটি অচল হয়ে যাওয়া জীবিকা।

Manual4 Ad Code

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মওজলুস গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক আবদুল মজিদের গল্প যেন এই সংকটের প্রতিচ্ছবি। ৩৫ হাজার টাকা ধার নিয়ে পাঁচ কিয়ার জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। আশা ছিল অন্তত ১২০ মণ ধান পাবেন। সেই ধান বিক্রি করে ঋণ শোধের পাশাপাশি পরিবার চালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু পাহাড়ি ঢল সেই স্বপ্ন এক নিমেষে ভেঙে দিয়েছে। কয়েক দিনের চেষ্টায় যে সামান্য ধান তুলেছেন, তাতেও খরচ ওঠার সম্ভাবনা নেই। এখন ঋণ শোধ আর পরিবারের ভরণপোষণ; দুটিই তার কাছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। শুধু তিনি নন; কালাইপুরা, বিরইমাবাদ, ঘরগাঁওসহ বিভিন্ন গ্রামের শত শত কৃষকের একই অবস্থা। মনু নদী প্রকল্পভুক্ত কাউয়াদীঘী হাওড়পাড়ে এখন কান্না আর হতাশার দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে।

হাওরের উন্নয়ন বলতে এখনো মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা ফসল রক্ষা বাঁধকেই বোঝানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রকল্প অনেক সময় ফসল রক্ষার চেয়ে সরকারি অর্থ অপচয় কিংবা লুটের সুযোগ তৈরি করে। এমন অভিযোগও কম নয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরে এই অপচয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলেই মনে করেন অনেকেই। অথচ এই অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা প্রকৃতিনির্ভর এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারক। একসময় মানুষ পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় করেই চাষাবাদ করত। কিন্তু এখন প্রযুক্তিনির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তববোধকে আড়াল করে দিচ্ছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে সর্বোচ্চ মুনাফার চিন্তাই যেন প্রাধান্য পাচ্ছে।

Manual1 Ad Code

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই-
১. মনু সেচ প্রকল্প সচল করা: কুশিয়ারা নদীতে পানি স্বাভাবিক থাকলে কাশেমপুর পাম্প হাউসের সব পাম্প একসঙ্গে চালু করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কাউয়াদীঘী হাওরের পানি অনেকাংশে সরানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।
২. শ্রমিক সংস্থান: জেলা প্রশাসন চা-বাগানের পার্টটাইম ও কর্মহীন শ্রমিকদের অস্থায়ীভাবে হাওরে কাজে লাগাতে পারে, যাতে দ্রুত ধান সংগ্রহ করা যায়।
৩. ধান সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ: রোদ না থাকায় সংগ্রহ করা ধান পচে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তাই জেলার সব অটোরাইস মিলকে দ্রুত ধান চালে রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন।

হাওরাঞ্চল ভাটির দেশ। এই বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ-উপযোগী, স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সঙ্গে সমন্বিত। নইলে প্রতি বছরই একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে; কৃষকের স্বপ্ন ডুবে যাবে, আর আমরা শুধু পরিসংখ্যান আর দায় এড়ানোর গল্পই শুনে যাব।

Manual3 Ad Code

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
sharifnews1@gmail.com

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code