

নিউজ ডেস্ক: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ার আশঙ্কা করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গেলে কী হবে, না গেলে কী হবে, তার পর্যালোচনা করতে গিয়ে দলের তৃণমূল নেতাদের জি এম কাদের এ কথা বলেন।
জি এম কাদেরের এ মতামত উঠে আসে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির জরুরি সভায়।
এতে পরিস্থিতি নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরলেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি।
তবে সভা সূত্র জানিয়েছে, এতে তৃণমূলের ৫৯ জন নেতা বক্তব্য দেন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরের একজন নেতা ছাড়া বাকি সবাই এবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দেন।
জি এম কাদেরও মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে নির্বাচনে গেলে জনগণ জাতীয় পার্টিকে ‘দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত করবে।
জাতীয় পার্টি সূত্র বলছে, নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা, তফসিলের আয়োজন, শর্তহীন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর চিঠি ইত্যাদি পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূলের নেতাদের মতামত জানতে জাতীয় পার্টি ওই সভার আয়োজন করে।
জাতীয় পার্টির ২৯৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এ সভায় ৬২টি জেলার এবং অঙ্গসংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরাও অংশ নেন। সকাল ১০টা থেকে মাঝে দুপুরে খাবারের বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সভা হয়।
জাপার শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও তাঁদের মধ্যে চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক ছাড়া কেউ বক্তব্য দেননি।
সভায় সবার বক্তব্য শেষে জি এম কাদের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতি আপনাদের (তৃণমূলের নেতা) ক্ষোভ আমরা বুঝি। এটাকে আমরা যথেষ্ট মূল্যায়ন করি। আপনাদের সেন্টিমেন্টের (আবেগ) সঙ্গে আমরা একমত।’
‘সুষ্ঠু নির্বাচন যদি না হয়, (সরকার) সংলাপ যদি না করে, তাহলে নির্বাচনে গেলে আমাদের (জাতীয় পার্টির) ওপর স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) আসতে পারে। তাদের (যুক্তরাষ্ট্র সরকার) কথায় বোঝা গেছে, তারা ব্যক্তিগত স্যাংশন দেবে,’ যোগ করেন জি এম কাদের।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে জাতীয় পার্টিকে সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি—তিনটি দলই খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু বেহিসেবি পদক্ষেপ নিলে দলগুলো গভীর খাদে নিমজ্জিত হতে পারে।
আওয়ামী লীগ কোনোভাবে পিছলে গেলে, ভুল পদক্ষেপ নিলে তাদের দীর্ঘ সময় ধরে মাশুল দিতে হতে পারে বলে উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, বিএনপি যদি নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। একই সমস্যা জাতীয় পার্টিরও। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে জাতীয় পার্টি অনেক ওপরে উঠে যাবে, ভুল পদক্ষেপ নিলে দলকে অস্তিত্বসংকটে পড়তে হবে।
সভায় উঠে আসা মতামতের কথা উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, বর্তমান সরকারের সঙ্গে কোনো রকম আপসে যেতে একমত নন দলের কেউ। সবাই আওয়ামী লীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর জাতীয় পার্টির কারণে ক্ষমতায় এলেও কখনো তা স্বীকার করেনি। তাদের মতে, দলটির প্রধানের মতে, তারা ‘ম্যানেজ’ করে ক্ষমতায় এসেছিল। তারা জাতীয় পার্টির কর্মীদের স্বাভাবিক মূল্যও দেয়নি। সংসদ সদস্যদের মর্যাদা দেয়নি।
জি এম কাদের বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গেলে কী হবে, না গেলে কী হবে, সবকিছু বিবেচনা করতে হবে। দলের নেতা-কর্মীরা ৩০০ আসনে নির্বাচন চান। আর যদি কোনো সমঝোতায় যেতে হয়, তাহলে হিস্যা ঠিকভাবে বুঝে নিতে হবে, এটা চান।
সঠিক ভোট হবে কি না, সেটা নিয়েও দলের নেতা-কর্মীদের শঙ্কা আছে উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, ‘এখন সঠিক ভোট না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে ক্ষমতা ধরে রেখেছে। লোকজনকে ভোট দিতে দিচ্ছে না। এভাবে নির্বাচন করা অর্থহীন। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গেলে জাতীয় পার্টি জাতীয় দালাল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।’
নির্বাচন বর্জন করলে কী হতে পারে, সেটার একটা ধারণা উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে। দলকে দুর্বল করতে নিপীড়ন করা হতে পারে। বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে।
এ সময় মাঠপর্যায়ের নেতারা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমরা রাজি।’ তাঁরা স্লোগান দিতে থাকেন।
জি এম কাদের ওই সময় বলেন, ‘কথার কথা বলছি, যদি নির্বাচনে যাই, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব। অনেকে বলছেন সে ক্ষেত্রে হিস্যা বুঝে নিতে হবে। এখন পরবর্তী সময়ে যদি সরকার সমস্যায় পড়ে, তাহলে আমাদের কী হবে?’
এ সময় মাঠপর্যায়ের নেতারা বলেন, ‘মানুষ আমাদের মারবে।’
জি এম কাদের বলেন, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। সমস্যাগুলো জানা থাকলে সমাধান নিয়ে এগোনো যায়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। অল্প কথায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ উপায়ে হতে হবে। সকল দলের সঙ্গে নিঃর্শত সংলাপ করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন যদি না হয়, সরকার যদি সংলাপ না করে, তাহলে নির্বাচনে গেলে আমাদের ওপর স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) আসবে। তাদের কথায় বোঝা গেল, ব্যক্তিগত স্যাংশন দেবে।’
সরকার ডোনাল্ড লুর চিঠিকে গুরুত্ব দিলে সংলাপের ব্যবস্থা করবে বলে মনে করেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, সরকার সংলাপ ডাকলে বিএনপিও আসতে পারে। জাতীয় পার্টিও যাবে। সেই পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনেও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি কী করবে, সেটাও বিশ্লেষণ করতে হবে।
জি এম কাদের বলেন, কী কী সমস্যা সামনে আসতে পারে, তা বুঝেশুনে তিনি এগোচ্ছেন। সব জায়গায় যোগাযোগ রাখছেন। সামনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে, আরও উত্তপ্ত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত এখন হঠাৎ করে নিতে পারব না। কিছু কন্ডিশনের (পরিস্থিতি) ওপর নিতে হবে।’ তবে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তাতে সবার মতামত প্রতিফলিত না হলেও দলের স্বার্থে সবাইকে সেই সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেন তিনি। সে ক্ষেত্রে আবেগের সঙ্গে বাস্তবতাকেও মূল্য দিতে বলেন তিনি।
জি এম কাদের বলেন, আগে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে কিছু লোক পিছু হটেছে। তাই ঐক্যবদ্ধ থাকা যায়নি। সবার ধারণা হয়েছে, জাতীয় পার্টিকে যেকোনোভাবে হাসিল করা যায়। তিনি এ সময় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের উদাহরণ টেনে বলেন, তাদের ভাঙার চেষ্টা করেও ভাঙতে পারছে না। ইচ্ছেমতো লোক টানতে পারছে না। ঐক্যই এখন জাতীয় পার্টির সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।