প্রকৃতিতে বছর ঘুরে আগামীকাল আসছে হেমন্ত

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual4 Ad Code

আগামীকাল হেমন্তের প্রথম দিন। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন ধান কাটার ধুম। গোলায় ধান তুলতে ব্যস্ত কৃষকরা। গতকাল গোদাগাড়ীর রাজাবাড়ী থেকে তোলা। ছবি : সালাহ উদ্দিন

‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/ হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে/ শুধু শিশিরের জল/ অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে/ হিম হয়ে আসে/বাঁশ পাতা- মরা ঘাস-আকাশের তারা/ বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা/ ধানক্ষেতে মাঠে-জমিছে ধোঁয়াটে/ ধারালো কুয়াশা/ ঘরে গেছে চাষা/ঝিমায়াছে এ-পৃথিবী’—কবি জীবনানন্দ দাশ হেমন্তের এমন বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ‘পেঁচা (মাঠের গল্প)’ কবিতায়। প্রকৃতিতে বছর ঘুরে আগামীকাল আসছে হেমন্ত।

Manual5 Ad Code

কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। বিকেলগুলো এখন স্বল্পায়ু। ৪টার পর থেকেই ছায়া ঘনিয়ে আসে। ৫টার পরই সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। দিন আরো ছোট হয়ে আসবে ক্রমেই। শরতের পরে আর শীতের আগে এ ঋতু এখন যেন কাগুজে ঋতুতে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে এ ঋতুর আবেশ বাঙালির ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

Manual4 Ad Code

গবেষকদের মতে, কৃষি প্রথা চালু হওয়ার পর থেকে নবান্ন উৎসব পালন হয়ে থাকে বাংলাদেশে।  কিন্তু ৪৭-এ দেশভাগের পর এই উৎসব ধীরে ধীরে কদর হারাতে থাকে। এখন সেটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশ উৎসবের দেশ। বারো মাসে তেরো পার্বণ। এটি ছিল বাঙালির একটি অন্যতম ঐতিহ্য। প্রচলিত উৎসবের মধ্যে নবান্ন উৎসব ছিল অন্যতম। হেমন্তকালে এ উৎসব ছিল সর্বজনীন। নবান্ন ঘিরে (নতুন ধান ঘরে তোলা উৎসব) গ্রামে গ্রামে চলত পিঠা-পুলি ও ক্ষীর-পায়েসের উৎসব। হেমন্তে ধান কাটা উৎসবে যোগ হতো সারি সারি গরু ও মহিষের গাড়ি। মাঠে মাঠে কৃষকরা দল বেঁধে ধান কাটা উৎসবে যোগ দিতেন। আর গেয়ে উঠতেন জারি-সারি, ভাটিয়ালিসহ নানা ধরনের গান। এককথায় গ্রামীণ জীবনে হেমন্তের আবহ ছিল অন্তপ্রাণে গাঁথা।

Manual2 Ad Code

হেমন্তে এখন উৎসব যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রামের পিঠা এসে যোগ হয়েছে শহরের হোটেল ও ফাস্ট ফুডের দোকানে। পিঠা উৎসবও এসে যোগ হয়েছে শহরের মেলা প্রাঙ্গণে। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের ঐতিহ্য থেকে। হেমন্তে ধান কাটা উৎসবে আর দেখা মেলে না সারি-সারি গরু ও মহিষের গাড়ি। এখন সেখানে যোগ হয়েছে ইঞ্জিনচালিত যান বা রিকশা ভ্যান। কিন্তু এখন আর সেই ঐতিহ্য নেই।

রাজশাহীর দুর্গাপুরের আমগাছী গ্রামের শতবর্ষী ছলেমান আলী বলেন, ‘কার্তিকে আগে অনেক মানুষ না খেয়ে থাকত। নতুন ধান উঠলে সেই কষ্ট দূর হতো। নতুন ধানের আলো চাল ও সেই চালের আটা দিয়ে মুড়ি-মুড়কি, খৈ, পাটিসাপটা, ভাপাপিঠা, পায়েসসহ নানা ধরনের পিঠার আয়োজন হতো। এখন আর হয় না। কিন্তু এখন আর না খেয়ে কাউকে থাকতে দেখি না। সবাই অন্তত তিন বেলা খেতে পারছে। এটা দেখে খুব ভালো লাগে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অগ্রহায়ণে শীতের সকালে খেজুর রসের সঙ্গে দুমুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে  কৃষক নেমে পড়ত কাজে। এখন সেখানে যোগ হয়েছে ভাত বা রুটি। পেট পুরে খেয়ে-দেয়ে মানুষ অনেক বেলা করে উঠেও দেখি কাজে বের হয়।’

রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী লেখক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, ‘একসময় কার্তিক মাসে আশ্বিনের স্বল্প-উৎপাদনশীল আউশ ধান চাহিদার তুলনায় অনেক কম পেতেন কৃষকরা। কিন্তু এখন সেখানে যোগ হয়েছে উচ্চ ফলনশীল জাতের নানা ধরনের ধান। ফলে এখন কোনো কোনো এলাকায় ছোট ছোট আকারে কার্তিকের শুরুতেই ধান কাটার মাধ্যমে নবান্ন উৎসব দেখা গেলেও আগের সেই জৌলুস যেন নেই। আবার অগ্রহায়ণে একমাত্র আমনের একসময় বাঙালি কৃষকদের ভরসা থাকলেও এখন প্রায় সারা বছরই উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উৎপাদন হচ্ছে। ফলে ধান কাটা ঘিরে গ্রামীণ উৎসব এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। যাতে করে পিঠা-পুলির আসরও তেমন বসছে না। সেসব আসর শীতের শহরের বিভিন্ন মেলা প্রাঙ্গণে এসে যোগ হয়েছে। আর শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা ফাস্ট ফুডের দোকানে সারা বছর মিলছে পাটিসাপ্টা-পুলি পিঠা। শীতে শহরের মোড়ে মোড়ে বিক্রি হয় এখন ভাপাপিঠা, যা আগে হেমন্তকালে খেজুরের নতুন গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেত বাঙালি। নবান্ন উৎসবে যোগ দিতে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হতো আত্মীয়-স্বজনকে। মেয়ে-মেয়েজামাই, নাতি-নাতনিতে ভরে উঠত কৃষকের ঘর।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code