ফিলিস্তিনে এখনো জ্বলছে আগুন

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

আবারও জ্বলছে ফিলিস্তিন। এক সপ্তাহ আগে গাজায় যে ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হয়, তা অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে ৫৮টি শিশুসহ প্রায় ২০০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জবাবে হামাসের রকেট হামলায় নিহত হয়েছে ১০ জন ইসরায়েলি, যাদের একজন সেনাসদস্য। অশান্ত হয়ে উঠছে পশ্চিম তীর, সেখানেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছে ১৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই।

হামাসের সামরিক শক্তি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে, জানিয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইতিমধ্যে গাজা সীমান্তে ইসরায়েলি সেনাবহর মোতায়েন করা হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে তারা স্থলপথে গাজা আক্রমণ করে বসতে পারে। এর আগে ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ স্থল হামলা সাত সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। হামাসের শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে হামলা চালানো হলেও সে লক্ষ্য যে অর্জিত হয়নি, এবারের হামলা থেকে তা স্পষ্ট।

ঘটনার সূত্রপাত পূর্ব জেরুজালেমে। আরব অধ্যুষিত এ শহরের কেন্দ্রে রয়েছে আল-আকসা মসজিদ, মুসলমানদের কাছে মক্কা ও মদিনার পর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। কয়েক সপ্তাহ ধরেই মসজিদের আশপাশে ফিলিস্তিনি ও ইহুদি যুবকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ শহরের শেখ জাররা এলাকায় কয়েক ঘর আরব পরিবারকে তাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা চলছিল। তার প্রতিবাদে আরবরা সংগঠিত হওয়া শুরু করে, হামাসও জানিয়ে দেয় শেখ জাররা থেকে আরবদের বহিষ্কার করা হলে তারা বসে থাকবে না।

Manual4 Ad Code

উত্তেজনা থামাতে ইসরায়েল প্রথমে আল-আকসার আশপাশে জমায়েত নিষিদ্ধ করে, এ এলাকার জনপ্রিয় দামেস্ক গেটে সামরিক ফাঁড়ি বসায়, ফিলিস্তিনিদের আগমন নিয়ন্ত্রিত করে। এতে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। পবিত্র রমজানের শুরুতে ইসরায়েলি সামরিক সদস্যরা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে ও প্রার্থনার জন্য আসা ফিলিস্তিনের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ফলে আহত হয় প্রায় ৩০০ ফিলিস্তিনি। প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে আরব জনগণ, দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায়। দক্ষিণ ইসরায়েলের একাধিক শহর লক্ষ্য করে হামাস রকেট নিক্ষেপ করলে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। শুরু হয়ে যায় পুরোদস্তুর যুদ্ধ।

সামরিক হামলার আশু প্রেক্ষাপট এটি হলেও এ মুহূর্তে নতুন করে সামরিক সংঘর্ষের ভিন্ন রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। এ হামলা ইসরায়েলের চলতি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, গাজার হামাস নেতৃত্ব ও পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ—সবার জন্যই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল।

নেতানিয়াহু বর্তমানে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের মুখে রয়েছেন। দুই মাস আগে ইসরায়েলে যে নির্বাচন হয়, তাতে তিনি একটি নতুন সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ জটিল হয়ে পড়ে। তাঁকে বাদ দিয়ে নেতানিয়াহুবিরোধী একটি জোট সরকার গঠনের দায়িত্ব পায়। এ সরকার গঠন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। পূর্ব জেরুজালেমে রাজনৈতিক অশান্তি ও হামাসের রকেট হামলা তাঁর জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। একমাত্র তিনিই পারেন ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, এ কথা প্রমাণ করতে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর নির্দেশ দেন তিনি।

মাহমুদ আব্বাস পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর ২০০৫ সাল থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। অধিকাংশ ফিলিস্তিনির চোখে প্রশাসক হিসেবে তিনি দুর্বল, ফিলিস্তিনি স্বার্থ রক্ষায় তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। নানা কারণে দীর্ঘ ১৫ বছর এখানে কোনো নির্বাচন হয়নি। অবশেষে মে মাসের ২২ তারিখে পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়। কিন্তু পূর্ব জেরুজালেমে ভোট গ্রহণ প্রশ্নে ইসরায়েলের সঙ্গে মতৈক্যের কারণে আব্বাস এককভাবে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন। অধিকাংশের ধারণা, জনমতে পিছিয়ে থাকা আব্বাস এ মুহূর্তে নির্বাচন হলে ভরাডুবির সম্মুখীন হবেন। পূর্ব জেরুজালেমে রাজনৈতিক অশান্তি ও গাজায় সামরিক সংঘর্ষ তাঁর জন্য শাপে বর হয়ে আসে।

হামাস এ যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হলেও রাজনৈতিকভাবে এ যুদ্ধ তার জন্যও লাভজনক প্রমাণিত হতে পারে। ২০০৬ সালে প্রথমবার নির্বাচনে জয়লাভ করে এ রাজনৈতিক আন্দোলন গাজায় কার্যত তাদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে সে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত হলেও ফিলিস্তিনি ও আরবদের চোখে তার পরিচয় যোদ্ধা হিসেবে। আব্বাস ও ফাতাহ ক্ষমতা ধরে রাখতে ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমাগত আপস করে গেছে, আর একমাত্র তারাই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে, এটি হামাসের দাবি। আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি হামলা ও শেখ জাররায় আরব পরিবার উচ্ছেদের ঘটনাকে ঘিরে নতুন যে যুদ্ধের সূত্রপাত হলো, সেটি হামাসের ‘লড়াকু’ পরিচয় আরও পোক্ত করবে, এটি তাদের বিশ্বাস।

সংকট সৃষ্টির গোড়া থেকেই ইসরায়েলের পাশে থেকেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারই অর্থায়নে ও সামরিক সমর্থনে সব আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি অগ্রাহ্য করে ইসরায়েল পশ্চিম তীর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের সৃষ্টির পর থেকে প্রতিটি ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত আঁতাত বজায় রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে এ আঁতাত আরও ঘনিষ্ঠ হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ইসরায়েলে তার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণ কর্মসূচির প্রতিও ট্রাম্প প্রশাসন নীল সংকেত জানায়।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের নির্বাচিত হওয়া ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এ নিঃশর্ত সমর্থন নীতি পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত বাইডেন পূর্বসূরিদের মতোই তাঁর সুর অপরিবর্তিত রেখেছেন। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানালেও বাইডেন প্রশাসন এ যুদ্ধের জন্য হামাসকে এককভাবে দায়ী করেছে। আগের প্রশাসনগুলোর মতো বাইডেনও জানিয়ে দিয়েছেন, আত্মরক্ষার সব অধিকার ইসরায়েলের আছে, আমেরিকা তার পাশে থাকবে। এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের একটি সর্বসম্মত বিবৃতি প্রদানেও তারা আপত্তি জানায়।

বাইডেনের দল ডেমোক্রেটিক মহলে অবশ্য ইসরায়েলের প্রতি অব্যাহত শর্তহীন সমর্থনের ব্যাপারে আপত্তি ওঠা শুরু হয়েছে। প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচিত সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স নিউইয়র্ক টাইমস–এ এক নিবন্ধে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ‘অধিক ভারসাম্যপূর্ণ’ অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। কংগ্রেসের ভেতরে একাধিক ডেমোক্রেটিক সদস্যও ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের অন্যতম হলেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেস। কংগ্রেসের দুই মুসলিম সদস্য রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে কঠোর ভাষায় একপেশে মার্কিন নীতির সমালোচনা করেছেন। মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত সিনেটর ক্রিস্টোফার ভ্যান হলেন বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন নিজেদের মানবাধিকারের প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দিতে চায়। কিন্তু ফিলিস্তিন প্রশ্নে যে অবস্থান তারা নিয়েছে, তা কোনোভাবেই সে পরিচয় প্রমাণ করে না।

কোনো কোনো ভাষ্যকার মনে করছেন, অধিকতর প্রগতিশীল সদস্যদের চাপের মুখে আগের মতো ইসরায়েলকে ঢালাও সমর্থন দেওয়া বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে সহজ হবে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো মনে করে, সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে বাইডেন প্রশাসনকে ইসরায়েলের প্রতি ‘অধিক কঠোর’ অবস্থান গ্রহণ করতে হতে পারে। ডেমোক্রেটিক সদস্য ওকাসিও-করতেসের কথা উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটনভিত্তিক পত্রিকাটি জানিয়েছে, ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে ‘প্রজন্মগত পরিবর্তন’ এসেছে। ফিলিস্তিনের ওপর অব্যাহত ইসরায়েলি অধিগ্রহণের মুখে বাইডেন প্রশাসন যদি নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণে ব্যস্ত থাকে, তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

Manual6 Ad Code

এ ভিন্ন সুর অবশ্য এখনো খুবই ক্ষীণ। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় দলই ইসরায়েল প্রশ্নে বরাবর একপেশে নীতি অনুসরণ করে এসেছে। ডেমোক্রেটিক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এখনো সেই নীতিই ধরে আছেন। তিনি বলেছেন, সব দোষ হামাসের, তারাই ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়ে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে। বাইডেনের কথার প্রতিধ্বনি করে তিনি বলেছেন, আত্মরক্ষার সব অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে।

গাজায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকায় অবিলম্বে সামরিক সংঘর্ষ বন্ধের দাবি বিভিন্ন মহলে জোরদার হচ্ছে। আলাপ-আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর তাদের বিশেষ দূত পাঠিয়েছে, তাঁরা ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। আরব দেশগুলোও জোর দাবি জানিয়েছে, যদিও সে দাবির কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ একাধিক আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে নিকট সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজে হাত লাগিয়েছে। এদের লক্ষ্য ইসরায়েলকে নয়, ইরানকে ঠেকানো।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গাজায় ইসরায়েলি হামলা অল্প কিছুদিনের মধ্যে হয়তো শেষ হবে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আশু সমাধান হবে—এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল সৃষ্টির পর যে সমস্যার শুরু, এত দিনে তা অধিকাংশের কাছে সহনীয় হয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী, বিশেষত জাতিসংঘ মাঝেমধ্যে বিবৃতি ও অল্পবিস্তর অনুদান প্রদানের মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমিত রেখেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত এ এলাকার আরব দেশগুলো। তাদের এখনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। যা নেই তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

Manual2 Ad Code

অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের জন্য ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ অর্থাৎ জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত মেনে ইসরায়েল ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু তেমন সমাধান অর্জনের জন্য যে চাপ, তা কার্যত অনুপস্থিত। ইসরায়েলের প্রধান রক্ষাকর্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক কৌশলগত। প্রগতিপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে তার অবস্থানে কোনো অর্থপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে, এ কথা যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁরা সম্ভবত মূর্খের স্বর্গেই বাস করেন। এ লড়াই ফিলিস্তিনিদের, তাদেরই এ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত।

Manual1 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code