বাংলা ভাষার যুদ্ধযাত্রা

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code

ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কংগ্রেসে দেওয়া বক্তৃতায় বলেছিলেন, He mobilised English language and sent in to battle. দানকার্ক-এর বিপর্যয়ের অব্যবহিত পর হাউজ অব কমন্সে চার্চিলের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘উই শ্যাল ফাইট ইন দি বিচেস, উই শ্যাল ফাইট ইন দি ল্যান্ডিং গ্রাউন্ডস, উই শ্যাল ফাইট ইন দি ফিল্ডস, উই শ্যাল ফাইট ইন দি স্ট্রিটস, উই শ্যাল ফাইট অন দি হিলস, উই শ্যাল নেভার সারেন্ডার’—এ ইংরেজি ভাষার যে ফোর্সফুল ব্যবহার তিনি করেছিলেন তা এক কথায় অতুলনীয়।

Manual7 Ad Code

অনেকের মতে, ব্রিটেন এবং মিত্রশক্তির সেই সময়কার সামরিক বাস্তবতার বিপরীতে চার্চিলের অদম্য মনোবল এবং মোটিভেশনাল স্পিচ ব্রিটিশ জাতির যুদ্ধ-সামর্থ্যের বড়ো জোগান দিয়েছিল। উইনস্টন চার্চিলের সেই বিখ্যাত বক্তৃতার ঠিক ২৯ বছর পর ভাষার যথাপ্রয়োগ আবারও একটি জাতির রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সামরিক অগ্রাভিযানের মুখবন্ধের রূপ লাভ করেছিল।

Manual5 Ad Code

এবার ভাষাটি ছিল ‘বাংলা’ এবং স্থান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান। শ্রোতা প্রায় ১০ লাখ মুক্তিকামী মানুষ, আদতে ৭ কোটি মানুষের মুক্তিকামী বাঙালি। শুরু করেছেন বিষাদ, শপথ, সংগ্রামের নিরেট ভারী কণ্ঠে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সাক্ষী মেনেছেন তারই জনগণকে, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি।’ তার কণ্ঠনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ধারণ করেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরের রাজপথে ঝরা রক্তের বিষাদ। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের ঊর্মিমালার দোলায় আন্দোলিত হয়েছে মুক্তির বারতা। উচ্চারিত শব্দের প্রতিটিতে তরঙ্গায়িত হয়েছে জাতির মুক্তির বাঁধভাঙা আকুতি। পদ্মা-মেঘনার মিলিত স্রোত যেন উপচে পড়েছিল তার শ্রাবণের ভরা মেঘের মায়াময় দরদি কণ্ঠে। শব্দ ছন্দে রচিত এক আশ্চর্য জাদুকরি কণ্ঠের সুনির্বাচিত মুখবন্ধ রচিত হলো সামরিক দক্ষতায়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতায়। আর একটা গুলি চললে, ২৮ তারিখ বেতন না দেওয়া হলে এবং মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করা হলে কী করতে হবে তার সরাসরি নির্দেশ তিনি দিয়েছেন অনন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দক্ষতায়। জনগণের নির্বাচিত সুপ্রিম পলিটিক্যাল লিডার হিসেবে যুদ্ধকালীন (তিনি জানতেন যুদ্ধ অনিবার্য এবং আগুয়ান) সরাসরি সামরিক নির্দেশও দিয়ে রেখেছেন—প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা-কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।

কেবল রাজনৈতিক, সামরিক মুখবন্ধে থেমে থাকেনি বঙ্গবন্ধুর এই কালজয়ী বক্তৃতার আবেদন। আইনি কাঠামো এবং সুস্পষ্ট সাংবিধানিক নির্দেশনায় সমৃদ্ধ হয়ে বাংলা ভাষার যুদ্ধযাত্রার নির্দেশনার পাশাপাশি রাষ্ট্রপত্তনের দার্শনিক ভিত্তিও তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে।’ বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের অনিবার্য উত্থানের আদিতেই জাতির নির্বাচিত সর্বাধিনায়ক জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের জন্য উদার সহনশীল বহু মত-পথের সমান্তরাল ভবিষত্ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। চাষাদের মুটেদের মজুরের গরিবের নিঃস্বের ফকিরের—আমার এ দেশ সব মানুষের। ‘হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান দেশমাতা এক সকলের’ যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল ৭ মার্চের সতর্কবাণীতে, ‘আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ জ্যাকব এফ ফিল্ড-এর সংকলিত ২৫০০ বছরের সেরা রাজনৈতিক ও সামরিক ভাষণগুলোর একটির স্রষ্টা হিসেবে বাঙালি জাতির প্রীতি ও শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু, হতে থাকবেন চিরকাল।

ইউনেস্কোর মতো জাতিসংঘ সংস্থা এবং জ্যাকবের মতো ভবিষ্যত লেখকরাও জানবেন এবং অনাগত পাঠককে জানাবেন কী অসীম মমতায়, দায়িত্বজ্ঞানে, দেশপ্রেমে সর্বোত্তম শুদ্ধাচারী রাজনীতিক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। পৃথিবী জানবে তিনি বিশ্বমানের এক অনন্য রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সম্পদ সৃষ্টি করেছেন শুধু বাংলার জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য। সমকালে তো বটেই সর্বকালে ধ্বনিত হতে থাকবে নির্যাতিত মানুষের লড়াইয়ের উদাত্ত আহ্বান, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’ আফ্রিকার জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্ত থেকে বাংলার শাপলা শালুকে, পদ্মা-মেঘনার বিস্তীর্ণ দুই পাড়ে, জনমনে, জনজাগরণে অম্লান থাকবে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসী কণ্ঠে বাংলা ভাষার যুদ্ধযাত্রার কৌশলী কিন্তু মানবিক উচ্চারণ। এই ‘বাংলার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বটাকে কাঁপিয়ে দিল কার সে কণ্ঠস্বর—মুজিবর সে মুজিবর।’ অনাগত জ্যাকবরা একদিন নিশ্চয় লিখবেন—‘বঙ্গবন্ধু মোবিলাইজড বাংলা ল্যাঙ্গুয়েজ ইন ১৯৭১ ইন রেসকোর্স অ্যান্ড সেন্ট টু ব্যাটেল ফিল্ড টু উইন লিবার্টি ফর হিজ পিপল।’

Manual3 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code