তবে বিএনপির এমন সিদ্ধান্তকে আমলে নিচ্ছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলটি বলছে, বিএনপি সংলাপে এলো কি এলো না, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করবে না। কেউ না এলেও নির্বাচন কমিশন গঠন থেমে থাকবে না। সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই রাষ্ট্রপতি ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন কমিশন উপহার দেবেন।
অন্যদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোনো দলের সংলাপে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে রাষ্ট্রপতি আয়োজিত এই সংলাপে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো সমাধান আসবে বলে তারা মনে করছেন না। তাদের মতে, এ সংলাপ ব্যর্থ হতে বাধ্য।
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ গত ২০ ডিসেম্বর থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। প্রথম দিন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংলাপ করেন তিনি। এরপর গত কয়েক দিনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলের তিন শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ছাড়াও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন রাষ্ট্রপতি। আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সংলাপে অংশ নেয়নি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আগামী ৩ জানুয়ারি সংলাপের জন্য বঙ্গভবনে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলেও সেখানে না যাওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া ২ জানুয়ারি গণফোরাম ও বিকল্পধারা বাংলাদেশ এবং ৩ জানুয়ারি গণতন্ত্রী পার্টির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।
এ অবস্থায় বিএনপি সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিল। যদিও এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত দল হিসেবে বিএনপিকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে কোনো চিঠি দেননি রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সংলাপের দিনক্ষণ এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।
‘কোনো লাভ নেই’ :নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিএনপি শুরু থেকেই কম গুরুত্ব দিয়ে আসছিল। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক বৈঠকেও বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। ওই সব বৈঠকে নেতারা রাষ্ট্রপতি সংলাপ আয়োজন করলে তাতে না যাওয়ার বিষয়ে তখনই মতামত দেন। তারা জানান, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন হলেও কোনো লাভ নেই। তাই আগে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায় করতে হবে।
বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, এখন তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে নজর দিতে চাইছেন। এই দাবি আদায়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে।
গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকার ছাড়া সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কোনো নির্বাচন কমিশনই করতে পারবে না। রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন, তার কোনো ক্ষমতা নেই পরিবর্তন করার। সে কারণে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ কোনো ইতিবাচক ফলাফল আনতে পারবে না। তাই বিএনপি অর্থহীন কোনো সংলাপে অংশ নেবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএনপির স্থায়ী কমিটি মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ব্যতীত নির্বাচন কমিশনের গঠন নিয়ে সংলাপ শুধু সময়ের অপচয়। বিগত দুটি নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছিল। বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেছিল। কিন্তু সব উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচনকালীন আওয়ামী লীগের দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে।
বিএনপির ভাষ্য, রাষ্ট্রযন্ত্রকে বেআইনি ব্যবহার, নির্বাচন কমিশনের চরম ব্যর্থতা, অযোগ্যতার কারণে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পরপর দুটি নির্বাচন কমিশনই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০১২ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান বলবৎ করে প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্র বিকাশের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। জনগণ তার ভোটের অধিকার হারিয়েছে।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই সংলাপ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে বিএনপি। সংলাপের সফলতা নিয়ে সবার নেতিবাচক মনোভাব পায় দলটি। একই সঙ্গে ২০০৮ সাল থেকে সরকারের একগুঁয়েমি ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে বিএনপিকে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন নেতা জানান, রাষ্ট্রপতির সংলাপে যোগ দিয়ে দলীয় নির্বাচন কমিশন গঠনে আর ‘সাক্ষীগোপাল’ হতে চায় না। একতরফা বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ কীভাবে আগামী নির্বাচন করে, সেটাই দেখবে বিএনপি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ইস্যুতে সরকারকে তারা আর ছাড় দেবে না।
আমলে নিচ্ছে না আ’লীগ :বিএনপির সিদ্ধান্তকে আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া ও নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বিএনপি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে সিপিবি, বাসদও সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সংলাপ থেমে নেই। কেউ সংলাপে না এলেও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন থেমে থাকবে না।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ২০১২ ও ২০১৬ সালেও রাষ্ট্রপতি সংলাপের আয়োজন করেছিলেন। ওই দুটি সংলাপের পর গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এবারও সংলাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি ‘গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন কমিশন উপহার দেবেন।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় সরকারি বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কেউ সংলাপে আসুক বা না আসুক, নির্বাচন কমিশন গঠন থেমে থাকবে না।
‘রাষ্ট্রপতির সংলাপ অর্থহীন এবং এই সংলাপে সংকটের সমাধান হবে না’- বিএনপির এমন বক্তব্যের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এর আগেও নির্বাচন কমিশন গঠনে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, এবারও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গতবারও বিএনপির তালিকা থেকেও একজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংলাপে বিএনপি যাবে কি যাবে না- সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার রাষ্ট্রপতির এই উদ্যোগ এগিয়ে যাবে। এই এগিয়ে যাওয়ার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি বা ষড়যন্ত্র সহ্য করা হবে না।
‘সংলাপ কার্যকর ফল আনবে না’ :সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংলাপে না যাওয়ার বিষয়টি বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এখানে আমার কোনো বক্তব্য নেই। তবে রাষ্ট্রপতির আয়োজিত এই সংলাপে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমাধান আসবে বলে আমি মনে করছি না।’
তিনি বলেন, ‘২০১২ ও ২০১৬ সালেও রাষ্ট্রপতি এ ধরনের সংলাপের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু সংলাপে বিরোধী দলগুলো যেসব মতামত দিয়ে এসেছিল, তৎকালীন নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সেসব মতামতের কোনো প্রতিফলনই ঘটেনি। তা ছাড়া সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া অন্যান্য সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হয়। তাই অতীতের মতো এবারও প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী পছন্দের নির্বাচন কমিশন গঠন হবে বলেই মনে করি। অতীতের নির্বাচন কমিশনগুলো দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, সে রকমটা এবারও ঘটবে বলেও আশঙ্কা করছি। তাই এই সংলাপ নিতান্তই একটা লোক দেখানো।’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রপতির সংলাপ অর্থহীন। এই সংলাপে কোনো কাজ হবে না। কারণ, রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা নেই। এটা শুধু সময় অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।
বিএনপির সংলাপে না যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বিএনপির আরও আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। সে ক্ষেত্রে তারা দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসতে পারত।’